লোগো
Advertisement

নারীদের ‘পিংক বাস’ সেবায় প্রতিদিনই লোকসান, বাড়ছে ভর্তুকির চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
Advertisement

নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিশেষ বাসসেবা চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। তবে চালুর পর থেকেই আয়-ব্যয়ের হিসাবে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে এ সেবায়। যাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া ভাড়ায় জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মীদের বেতনসহ পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নারী বাসসেবা সচল রাখতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

বিআরটিসির সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নারী বাসসেবায় প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৫০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিআরটিসির ১৯ থেকে ৩১ আগস্ট এবং ১ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে ১২ কার্যদিবসে ১৫৮টি ট্রিপ পরিচালনা করা হয়েছে। এসব ট্রিপে ১৪ হাজার ১১৬টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৮ টাকা।

অন্যদিকে আগস্টে আট কার্যদিবসে ১১৪টি ট্রিপে ৬ হাজার ৬৮৯টি টিকিট বিক্রি হয়। এ সময়ে আয় হয়েছে ৯৮ হাজার ৬৪৬ টাকা।

জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণেই বড় ঘাটতি

আয়-ব্যয়ের চিত্র বোঝাতে মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিল রুটের হিসাব সামনে আসে। এ পথে একদিকে দূরত্ব ২১ কিলোমিটার। যাওয়া-আসা মিলিয়ে একটি ট্রিপে বাসকে ৪২ কিলোমিটার চলতে হয়।

এক লিটার ডিজেলে একটি বাস গড়ে ২ থেকে আড়াই কিলোমিটার চলতে পারে ধরে নিলে, প্রতি ট্রিপে প্রয়োজন হয় প্রায় ১৬ দশমিক ৮ থেকে ২১ লিটার ডিজেল। প্রতি লিটার ১১৫ টাকা হিসাবে শুধু জ্বালানি বাবদ খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৯৩২ থেকে ২ হাজার ৪১৫ টাকা।

এর সঙ্গে প্রতি কিলোমিটারে সাত টাকা হিসাবে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় যোগ করলে একটি ট্রিপে এ খাতে খরচ হয় আরও ২৯৪ টাকা। অর্থাৎ জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ মিলিয়ে প্রতি ট্রিপে ব্যয় প্রায় ২ হাজার ২২৬ থেকে ২ হাজার ৭০৯ টাকা।

সেপ্টেম্বরের ১৫৮টি ট্রিপ যদি একই ২১ কিলোমিটার রুটের হিসাব ধরে বিবেচনা করা হয়, তাহলে বাসগুলো মোট ৬ হাজার ৬৩৬ কিলোমিটার চলেছে। এতে আনুমানিক ২ হাজার ৬৫৪ থেকে ৩ হাজার ৩১৮ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়েছে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী এর দাম প্রায় ৩ লাখ ৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা।

এর সঙ্গে প্রায় ৪৬ হাজার ৪৫২ টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় যোগ হলে শুধু জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণেই মোট খরচ দাঁড়ায় আনুমানিক ৩ লাখ ৫২ হাজার থেকে ৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা। অথচ একই সময়ে টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৮ টাকা।

অর্থাৎ, সর্বনিম্ন জ্বালানি ব্যয় ধরলেও শুধু ডিজেলের খরচই টিকিট বিক্রির আয়ের চেয়ে প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার টাকা বেশি। জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ একসঙ্গে ধরলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ ২৬ হাজার টাকা।

এর বাইরে চালক, সহকারী ও অন্যান্য কর্মীর বেতন, টায়ার, লুব্রিকেন্ট, কর, প্রশাসনিক ব্যয় এবং বাসের অবচয়সহ আরও বেশ কিছু খরচ রয়েছে।

আগস্টেও একই চিত্র

আগস্টের হিসাবেও আয়-ব্যয়ের বড় ব্যবধান দেখা গেছে। ওই মাসে ১১৪টি ট্রিপে ৪২ কিলোমিটার করে মোট চলাচলের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৭৮৮ কিলোমিটার।

এই দূরত্বে আনুমানিক ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ডিজেল প্রয়োজন হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৫১৬ টাকা। অথচ টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে মাত্র ৯৮ হাজার ৬৪৬ টাকা।

চালক ও কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ যোগ করার আগেই জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা।

যাত্রী কম, খালি থাকছে আসন

নারীদের জন্য চালু করা এই বিশেষ বাসসেবায় প্রত্যাশা অনুযায়ী যাত্রী মিলছে না বলেও বিআরটিসির তথ্য থেকে জানা গেছে। ৬০ আসনের একটি বাসে প্রতি ট্রিপে গড়ে প্রায় ২০টি আসন খালি থাকছে।

বিআরটিসির কর্মকর্তারা মনে করছেন, যাত্রীসংখ্যা বাড়ানো গেলে টিকিট বিক্রি থেকে আয় বাড়বে এবং পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের ব্যবধানও কমবে।

বিআরটিসির ব্যবস্থাপক মো. নূর-ই-আলম বলেন, নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াতের কথা বিবেচনা করেই এ সেবা চালু করা হয়েছে। তাই শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে সেবাটির প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা হচ্ছে না। তবে নিয়মিত ভর্তুকির কারণে করপোরেশনের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাসের সংখ্যা বাড়লে আয়ও বাড়বে। শুরুর সময়ের তুলনায় বর্তমানে ভর্তুকির পরিমাণ ধীরে ধীরে কমছে। একটি ট্রিপে অন্তত ১২০ জন যাত্রী পাওয়া গেলে আয় ও ব্যয় প্রায় সমান পর্যায়ে আসবে। এর বেশি যাত্রী হলে লাভের সুযোগ তৈরি হবে।

শুক্র ও শনিবার বন্ধ ‘পিংক বাস’

সাধারণ গণপরিবহন সপ্তাহের সাত দিন চললেও বিআরটিসির নারী বাসসেবা শুক্র ও শনিবার বন্ধ থাকছে। ফলে সপ্তাহের দুই দিন এই বিশেষ সেবা পাচ্ছেন না নারী যাত্রীরা।

বিআরটিসির অন্যান্য বাস ওই দুই দিনও চলাচল করলেও নারী বাসসেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সপ্তাহে দুই দিন বাস বন্ধ থাকায় একদিকে যাত্রীসেবার পরিধি কমছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সংস্থাটি।

এ বিষয়ে বিআরটিসির ব্যবস্থাপক মো. নূর-ই-আলম বলেন, শুক্র ও শনিবার কর্মজীবী নারী যাত্রী তুলনামূলক কম থাকায় ওই দুই দিন ‘পিংক বাস’ চালানো হচ্ছে না।

১৪ বাস নিয়ে যাত্রা শুরু

গত ১৮ আগস্ট ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ বা ‘পিংক বাস’ চালু করে বিআরটিসি। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় ১৩টি রুটে ১৪টি বাস দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়।

এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ১০টি বাস, চট্টগ্রামে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি। ঢাকায় চলাচলকারী বাসগুলোর একটি একতলা এবং নয়টি দ্বিতল।

নারীদের জন্য আলাদা এই পরিবহনসেবা চালুর অন্যতম লক্ষ্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করা হলেও বর্তমানে কম যাত্রী, পরিচালন ব্যয় এবং ভর্তুকির কারণে সেবাটির আর্থিক টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...