প্রায় আট মাস পর প্রকাশ হলো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে তদন্ত প্রতিবেদন। ২২ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি। তবে সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
মঙ্গলবার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে তদন্ত প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন কমিটির প্রধান ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম ওয়ালী উল্লাহ। কমিটির অপর দুই সদস্য ছিলেন সাবেক অধিনায়ক ও বিসিবির প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর।
তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বর্তমান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারত থেকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে বাংলাদেশ দল না পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছিল যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের অনুরোধ জানায়। তবে সেই আবেদন গ্রহণ করেনি আইসিসি।
এর আগে জানুয়ারিতে আইসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়নে বাংলাদেশ দলের জন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও যাচাইযোগ্য নিরাপত্তা হুমকির তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ম্যাচের ভেন্যু পরিবর্তন করলে সূচি ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন দাবির নজির তৈরি হতে পারে বলেও উল্লেখ করেছিল আইসিসি।
‘একজনের সিদ্ধান্ত’ নিয়ে প্রশ্ন
তদন্ত প্রতিবেদনের ১৯ নম্বর পাতায় উল্লেখ করা হয়েছে, এত বড় সিদ্ধান্ত একজন ব্যক্তির নেওয়া উচিত নয়। তবে লিখিত প্রতিবেদনে ওই ব্যক্তির নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীরকে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট করেন, এখানে তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তের কথাই বোঝানো হয়েছে।
কার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি—এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কমিটির প্রধান ড. এ কে এম ওয়ালী উল্লাহ বলেন, ‘এটা সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল।’
তিনি আরও বলেন, তদন্ত কমিটির দায়িত্ব ছিল পুরো ঘটনার ধারাবাহিকতা তুলে ধরা; কাউকে দায়ী করা নয়। সরকারের সিদ্ধান্ত হওয়ায় সরকারকে দোষারোপ করার বিষয়টিও তারা প্রতিবেদনের আওতায় রাখেনি।
অন্যদিকে ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, তদন্ত কমিটির বিবেচনায় বাংলাদেশের বিশ্বকাপে যাওয়া উচিত ছিল এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতও ছিল একই ধরনের।
তবে বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল কি না—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, সে সময়কার পরিস্থিতিতে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং মন্ত্রণালয়ের চিঠির ভিত্তিতে বিসিবি সেই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে।
তিন পক্ষের সঙ্গে কথা বলতে পারেনি কমিটি
তদন্ত প্রতিবেদনের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হিসেবে উঠে এসেছে, সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তিন পক্ষের কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেনি তদন্ত কমিটি। তারা হলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, তৎকালীন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম এবং আইসিসি।
কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর জানান, আমিনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
ফলে আসিফ নজরুলের অবস্থান তুলে ধরতে তার আগের সাক্ষাৎকার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে তদন্ত কমিটিকে।
শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ সরানোর চেষ্টা
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ শুরু থেকেই পুরোপুরি সরে যেতে চায়নি বলে তদন্তের তথ্য থেকে উঠে এসেছে। ভারতে খেলতে আপত্তি থাকলেও শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের দাবি জানিয়েছিল বিসিবি।
জানুয়ারিতে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামও জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলতে আগ্রহী। তবে ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের বিষয়ে আইসিসির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছিল বোর্ড।
শেষ পর্যন্ত আইসিসি ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি প্রত্যাখ্যান করায় বিষয়টির সমাধান হয়নি এবং বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণও সম্ভব হয়নি।
ভবিষ্যতের জন্য সাত সুপারিশ
ঘটনার কারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পর্যালোচনার পাশাপাশি বিসিবির কাঠামোগত দুর্বলতা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কথাও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সাতটি সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের বাইরে রাখা, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের স্বার্থ সুরক্ষায় সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, বিসিবির স্বায়ত্তশাসন আরও কার্যকর করা এবং বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও যোগাযোগের কাঠামো স্পষ্ট করার বিষয় রয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের মধ্য দিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়া নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনায় নতুন করে সরকারি সিদ্ধান্ত ও বিসিবির ভূমিকা সামনে এসেছে।


