লোগো
Advertisement

ঘুষ-হয়রানি বন্ধে সচিবদের সতর্ক থাকার নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৮ এএম
Advertisement

সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যাতে ঘুষ, হয়রানি কিংবা কোনো ধরনের অনিয়মের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে সচিবদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনে জবাবদিহি বাড়াতে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার বিকেলে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সচিব সভায় এসব বিষয়সহ প্রশাসনের শৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় সাত মাস পর এটিই ছিল প্রথম সচিব সভা। সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধিকাংশ সচিব অংশ নেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে প্রশাসনের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর বিষয়ে সচিবদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সভায় সরকারি সেবাকে আরও জনবান্ধব করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেবা নিতে আসা নাগরিকদের অযথা দপ্তরে দপ্তরে ঘোরানো, কোনো কাজে বিলম্ব করা কিংবা অনৈতিক সুবিধা দাবি করার মতো অভিযোগ যেন না ওঠে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ বা অনৈতিক সুবিধা চাওয়ার অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করে জনগণের কাছে সরকারি সেবার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎ

সচিব সভায় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের সম্ভাব্য ওঠানামা এবং বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাব বিবেচনায় রেখে আগাম প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সভায় অংশ নেওয়া এক সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘আমার দেশ’কে জানান, ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে বলে জানান ওই সচিব। সরকারি ভবন ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন, বেসরকারি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া এবং মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তির অংশ বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার কথাও আলোচনায় এসেছে। সৌর প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যয় কমানো এবং ভবিষ্যতের জ্বালানি ঝুঁকি মোকাবিলার সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ডিজিটাল হাজিরায় নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ

প্রশাসনের শৃঙ্খলা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতেও একাধিক বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা।

সচিব সভায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে কে কখন অফিসে উপস্থিত হচ্ছেন, তা সহজে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে শৃঙ্খলা বাড়বে এবং কর্মঘণ্টা নিয়ে জবাবদিহিও নিশ্চিত করা সহজ হবে।

সরকারি সেবার মান বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়মিত নজরদারিতে থাকলে সেবা নিতে আসা মানুষের অপেক্ষার সময় ও ভোগান্তি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

ফ্যামিলি কার্ডে স্বচ্ছতার নির্দেশ

সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিগুলোর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নিয়েও সচিব সভায় আলোচনা হয়েছে। কর্মসূচির সুবিধা যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সুবিধা বিতরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কোনো ধরনের পক্ষপাত, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির কারণে প্রকৃত দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যাতে কর্মসূচির বাইরে চলে না যান, সে বিষয়ে মাঠ প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি নীতিমালাও রয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর এ কর্মসূচির বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত।

সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। কুমিল্লার চান্দিনায় কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কয়েকজন নারীর কাছ থেকে টাকা ও কাগজপত্র নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। ফলে সচিব সভায় কর্মসূচিটির বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও নজরদারির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

খাল খনন প্রকল্পে কাজের মান দেখার নির্দেশ

সরকারের আরেকটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি খাল খনন নিয়েও সচিব সভায় আলোচনা হয়েছে। প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না এবং নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, তা মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই হবে না, খাল খননের পর স্থানীয় জনগণ বাস্তবে কী ধরনের সুফল পাচ্ছেন, সেটিও দেখার কথা বলা হয়েছে। সরকারি অর্থ ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে মাঠ প্রশাসনকে নিয়মিত নজরদারি করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

কাজের নামে যাতে অর্থের অপচয় না হয় কিংবা নিম্নমানের কাজ করে সরকারি অর্থ ব্যয় না করা হয়, সেদিকেও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ

সরকারি সম্পত্তি রক্ষা এবং ইতোমধ্যে বেদখলে যাওয়া সম্পত্তি উদ্ধারের বিষয়টিও সচিব সভার আলোচনায় এসেছে। সরকারি জমি, ভবন বা অন্য কোনো সম্পদ যাতে অবৈধভাবে দখল হয়ে না যায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

যেসব সরকারি সম্পত্তি ইতোমধ্যে দখল হয়ে গেছে, সেগুলো উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার কিংবা অবৈধ দখলের সুযোগ বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশনার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলাতেও নজর

সচিব সভায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই নয়, মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে সভায়।

সব মিলিয়ে প্রথম সচিব সভায় প্রশাসনে গতি আনা, সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় রাখার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের প্রভাব মোকাবিলা, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিগুলোতে অনিয়ম ঠেকানোর বিষয়েও সচিবদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সমন্বয় বাড়িয়ে এসব সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, এখন সেটিই সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্র: আমার দেশ

আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...