ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ন্যাটোর সদস্য দেশ লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় বেলারুশের দিক থেকে প্রবেশ করা একটি সন্দেহভাজন রুশ ড্রোন ভূপাতিত করেছে ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা মিশনে থাকা ইতালির একটি যুদ্ধবিমান।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় ড্রোনটি শনাক্ত করা হয়। দেশটির জাতীয় সংকট ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র জানিয়েছে, বেলারুশের দিক থেকে ড্রোনটি লিথুয়ানিয়ায় প্রবেশ করে। পরে মধ্যাঞ্চলের প্রাতকুনাই শহরের কাছে সেটি ভূপাতিত করা হয়। এলাকাটি দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কাউনাসের উত্তরে অবস্থিত।
লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্টাস কাউনাস জানিয়েছেন, ড্রোনটিতে বিস্ফোরক থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে ড্রোনটি রাশিয়ার তৈরি কি না, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে এটি অন্য কোনো দেশের তৈরি কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এ সময় ইতালির যুদ্ধবিমানের হস্তক্ষেপের প্রশংসা করে তিনি বলেন, মিত্র দেশের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালনের বিষয়টি এ ঘটনা আবারও স্পষ্ট করেছে।
ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন। তিনি এটিকে ইউরোপের বিরুদ্ধে আগ্রাসন ও উসকানির ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়েডফুলও এ ঘটনার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছেন। তার বক্তব্য, ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোকে ভয় দেখিয়ে তাদের অবস্থান থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তবে অভিযোগের বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় ড্রোন প্রবেশের এক দিন আগেও বাল্টিক অঞ্চলে উত্তেজনার আরেকটি ঘটনা ঘটে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বাল্টিক সাগরে একটি রুশ যুদ্ধজাহাজ পর্যবেক্ষণকারী ডেনমার্কের সামরিক হেলিকপ্টারের দিকে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ফ্লেয়ার ছোড়ার অভিযোগ ওঠে।
এর পরদিন লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় ড্রোন শনাক্ত ও ভূপাতিত করার ঘটনায় বাল্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পোল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিস্লাভ কোসিনিয়াক-কামিশও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, রাশিয়ার কর্মকাণ্ড পুরো ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার পরই মূলত সীমান্তবর্তী ন্যাটো দেশগুলোতে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। রোববার ইউক্রেনে একাধিক ড্রোন হামলার পর ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে কিয়েভকে আরও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন।
এর আগে পোল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি একটি ট্রেনেও রুশ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ ওঠে। ওই হামলার কয়েক মিনিট আগে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধি দল সংশ্লিষ্ট স্টেশন অতিক্রম করেছিল।
লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্টাস কাউনাস এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখন আর শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব আশপাশের দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও পড়ছে। আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের সমাধান না হলে এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।
কাউনাস আরও দাবি করেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এগোতে আগ্রহী নন।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনার পর ইউরোপের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এবং বাল্টিক অঞ্চলে নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর ভূখণ্ডে কতটা ছড়িয়ে পড়তে পারে, তা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগও বাড়ছে।


