গত সাত মাসে দেশে রাজনৈতিক কারণে কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। একই সঙ্গে বর্তমান সরকার দেশে ‘স্মরণকালের সর্বোচ্চ’ বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে তার এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানিয়েছেন, তাদের কাছে থাকা তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিতামূলক সরকার ব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেন মাহ্দী আমিন ও ইফতেখারুজ্জামান।
আলোচনায় মাহ্দী আমিন বলেন, গত সাত মাসে রাষ্ট্রীয় মদদে কোনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। বিরোধী দলের মত, পথ বা ভিন্ন আদর্শের অধিকারও হরণ করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন একসঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মাহ্দী আমিন আরও বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী হয়। নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
‘তথ্য ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে’
মাহ্দী আমিনের বক্তব্যের পর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেনি এমন বক্তব্যের সঙ্গে তাদের কাছে থাকা তথ্যের মিল নেই।
টিআইবির তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, গত সাত মাসে বাকস্বাধীনতা চর্চার কারণে অন্তত ৫২টি হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে ৫৮ জনকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি হেফাজতে নির্যাতনের ৫১টি ঘটনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সাতজনের মৃত্যুর ঘটনা এবং একটি গুমের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানান তিনি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও পুলিশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিয়ে এখনো উদ্বেগ রয়েছে। কন্যাশিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জবাবদিহিতার ওপর জোর টিআইবির
আলোচনায় ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের জন্য এখন একটি কার্যকর ও জবাবদিহিতামূলক সরকারব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগ বা আইন বাতিল হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, গুমসংক্রান্ত আইন, মানবাধিকার আইন সংস্কার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামোগত সংস্কারের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, কন্যাশিশু ও নারীর ওপর সহিংসতা, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু এবং পর্যাপ্ত জনসম্পৃক্ততা ছাড়া আইন প্রণয়নের মতো বিষয়গুলো গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
‘গণতন্ত্র এখন ব্যবসায়ীদের জন্য’ মনীষা
আলোচনায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) জেলা সমন্বয়ক মনীষা চক্রবর্তী সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার অভিযোগ, অর্থ ও ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রভাবের কারণে গণতন্ত্র সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে না।
তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ তুলে বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে এনসিপির সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা বলেন, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে এখনো সাধারণ মানুষকে অনেক ক্ষেত্রে প্রজার মতো আচরণের মুখোমুখি হতে হয়। আইন প্রণয়ন ও খসড়া তৈরির ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণও যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষ্য, ভোটের সময় জনগণের গুরুত্ব বাড়লেও পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের মতামত ও অংশগ্রহণের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থাকে।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের এই আলোচনা সভায় গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ নিয়ে বক্তারা বিভিন্ন মত তুলে ধরেন। মাহ্দী আমিনের দাবি ও টিআইবির তথ্যের পার্থক্যই সভার আলোচনায় অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।


