মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার জেরে কমছে জনশক্তি রপ্তানি: ৯ মাসে বিদেশে কর্মী যাওয়া কমেছে ৩৩ শতাংশ

ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, আঞ্চলিক সংঘাত ও বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিমালার কড়াকড়িতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিদেশের প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে চরম মন্দা দেখা দিয়েছে। এর বড় ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিতে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কমে গেছে। বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে কর্মী যাওয়ার গতি লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় বাজারগুলোতে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার কারণে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন কর্মী জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়েছিলেন। অথচ চলতি বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা নেমে এসেছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩ জনে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় দেশ ছেড়ে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা কমেছে ২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ জন। চলতি বছরের ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বিএমইটি থেকে মোট ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন কর্মী বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র সংগ্রহ করেছেন।
সৌদি আরবে কর্মী গমন কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে যেখানে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ জন কর্মী দেশটিতে গিয়েছিলেন, সেখানে চলতি বছরের একই সময়ে গেছেন ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জন। হিসাব অনুযায়ী কর্মী যাওয়ার হার কমেছে ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে পাড়ি জমান, যার মধ্যে একাই সৌদি আরবেই গিয়েছিলেন ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন।
সম্প্রতি হুতিদের হামলার ঘটনায় সৌদি আরবের শ্রমবাজার আরও টালমাটাল রূপ নিয়েছে। সেখানে অবস্থানরত প্রবাসীরা যেমন প্রতিনিয়ত মিসাইল আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন, তেমনি দেশে এসে আটকে পড়া কর্মীদের ভোগান্তিও চরমে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ছুটিতে এসে প্রায় ২০ হাজার প্রবাসী আটকা পড়েছেন। তাদের অনেকেই সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে চাকরি হারানোর শঙ্কায় ভুগছেন।
বিমান চলাচলে জটিলতা ও বাড়তি ব্যয়ের চাপ
রিয়াদ ও দাম্মামে সরাসরি বিমান চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে বিকল্প পথে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রবাসীরা। এতে টিকিটের অস্বাভাবিক দাম ছাড়াও অভ্যন্তরীণ পরিবহনে বিপুল অর্থ গচ্চা যাচ্ছে। দীর্ঘ ১৫ মাস পর সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে ঢাকায় ফিরেছেন সুবল দাস। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশে ফেরার স্বস্তি থাকলেও মনে অনেক আক্ষেপ জমেছে। দুদিন আগেও টিকিটের দাম ছিল এক হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার রিয়াল। কিন্তু মাত্র এক দিনের ব্যবধানে সেই টিকিটের দাম বেড়ে ২ হাজার ৬০০ রিয়ালে দাঁড়িয়েছে। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ৬০০ থেকে ৭০০ রিয়াল খরচ করে টিকিট কিনতে হয়েছে।
ফরিদপুরের আতিয়ার মণ্ডল গত ১৪ অক্টোবর রিয়াদ থেকে দেশে ফেরার টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু রিয়াদের ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেলে তাকে বাধ্য হয়ে জেদ্দা থেকে নতুন টিকিট কাটতে হয়। রিয়াদ থেকে বাসে করে মক্কা, সেখান থেকে আবার বাসে জেদ্দায় গিয়ে তবেই দেশে ফেরার উড়োজাহাজে চাপতে পেরেছেন তিনি। এতে একদিকে যেমন বাড়তি অর্থের অপচয় হয়েছে, অন্যদিকে পোহাতে হয়েছে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি।
রিয়াদে কর্মরত প্রবাসী নাজমুল ইসলাম নিজের আতঙ্কের কথা তুলে ধরে জানান, প্রতিদিন মিসাইলের ভয় মাথায় নিয়ে তাদের কাজে বের হতে হয়। নিজেরা যেমন শান্তিতে নেই, তেমনি দেশে পরিবারের সদস্যরাও উদ্বেগে থাকেন। যারা ছুটিতে দেশে গেছেন, তারা কীভাবে ফিরবেন—তা নিয়েও দুশ্চিন্তা কাটছে না।
রেমিট্যান্সের হালচাল ও অল্প কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। অবশ্য আগের বছরের একই মাসের চেয়ে এটি ৩ শতাংশ বেশি। এর আগে আগস্টে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে প্রবাসী আয় এসেছে ৮ হাজার ৫৯১ মিলিয়ন ডলার; আগের অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে দীর্ঘদিনের বাজারনির্ভরতার এক স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০৩টি দেশে কর্মী গেলেও মোট ১ কোটি ১০ লাখের বেশি কর্মীর প্রায় ৭৯ শতাংশেরই গন্তব্য ছিল মাত্র পাঁচটি দেশ। কর্মীদের ৯৪ শতাংশ গেছেন শীর্ষ ১০টি দেশে। অন্যদিকে দেড় দশকে ৯৮টি দেশে গড়ে ১০০ জন কর্মীও পাঠানো সম্ভব হয়নি।
আমিরাত ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে জটিলতা
মালয়েশিয়ায় ২০২৪ সালের জুন মাসে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে কর্মী পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নতুন করে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা দিলেও কতজন যেতে পারবেন বা প্রক্রিয়া কত দ্রুত শেষ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওমানেও ২০২৪ সাল থেকে কর্মী নিয়োগ কার্যত স্থগিত রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০২৩ সালে যেখানে প্রায় এক লাখ কর্মী গিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে তা নেমে আসে মাত্র ১৩ হাজার ৭৫০ জনে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বিক্ষোভের ঘটনায় ৫৭ জন বাংলাদেশি কারাদণ্ড পাওয়ার পর দেশটি ভিসা দেওয়া স্থগিত করে। বর্তমানে সাধারণ কর্মীদের ভিসা বন্ধ থাকলেও উচ্চ পেশাদারদের ভিসা চালু রয়েছে। সেখানে কর্মরত ১০ থেকে ১২ লাখ বাংলাদেশির মধ্যে অনেকে ভিসা নবায়ন নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। জুলাইয়ের পর থেকে প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি অবৈধ হয়ে পড়েছেন বলে মন্ত্রণালয়ের তথ্যে জানা গেছে। কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের হামলার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার বা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করে অনেকের ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
অবশ্য গত ১৩ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিনের এক বৈঠকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, ট্যাক্সি ও ট্রাকচালক নিয়োগ এবং দক্ষ কর্মী পাঠানো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া জাপানের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী আগামী বছরের ১ এপ্রিল থেকে কর্মী নিয়োগ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও পাঁচ বছর বাড়তে পারে, তবে কর্মীর সংখ্যা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বিকল্প গন্তব্যের ঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
চিরাচরিত বাজারের বাইরে গিয়ে নতুন গন্তব্যে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অনেক কর্মী। কম্বোডিয়ায় কলসেন্টারে চাকুরির লোভ দেখিয়ে সাইবার অপরাধে যুক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিএমইটির হিসাবে ২০২৫ সালে কম্বোডিয়ায় ১২ হাজার ২৬৩ জন এবং রাশিয়ায় ৪ হাজার ৭২৭ জন কর্মী ছাড়পত্র নিয়ে গেছেন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর জানান, দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধান ছাড়া উপায় নেই। কোন দেশে কী ধরনের কাজের সুযোগ রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী কর্মীদের ভাষাগত ও পেশাগত প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে এসব কথা বলা হলেও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়নের অভাবে সংকট থেকেই যাচ্ছে।

