ভাঙনঝুঁকিতে ১৫০ কিলোমিটার, নদীতীরের মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়

তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর গতিপ্রকৃতি, পানির প্রবাহ ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবছরই বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নদীভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। চলমান প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর সংরক্ষণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা আরও অনেক এলাকা সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
আবু বকর সিদ্দিক আরও বলেন, চলমান ও প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে নদীভাঙনের তীব্রতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে নদীতীরবর্তী মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি রক্ষার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং জনপদও সুরক্ষিত থাকবে।
নদীতীরের মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়
নদীভাঙনের এই দুর্ভোগের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে নদীতীরের মাটি কেটে নেওয়ার ঘটনা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাতের আঁধারে একটি চক্র নদীর পাড় কেটে মাটি নিয়ে যাচ্ছে ইটভাটায়। এর সঙ্গে প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করেই আমাদের বাঁচতে হয়। এর মধ্যে ইটভাটার জন্য নদীর পাড়ের মাটি কাটা হচ্ছে। রাতের আঁধারে একটি চক্র মাটি নিয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলেও হুমকির শিকার হতে হয়।

আসলাম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোতে মাটি সরবরাহের জন্য পাড় কেটে নেওয়া হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নদীভাঙন রোধে সরকারের নেওয়া উদ্যোগও কাজে আসবে না বলে আশঙ্কা তার।
এ বিষয়ে বরিশালের পুলিশ সুপার এ জেড এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নদীর পাড়ের মাটি কাটার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য বা লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যে-ই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
ভাঙন ঠেকাতে সরকারের মেগা প্রকল্প
সম্প্রতি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন এবং নৌপরিবহন ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান। ভাঙন ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের পাশাপাশি কিছু এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে নদীতীর রক্ষার কাজও শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন থেকে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় ৭৩৯ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। প্রকল্পের আওতায় নদীর ১১ দশমিক ৪০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণে নির্মাণ করা হবে প্রতিরক্ষা বাঁধ। পাশাপাশি নদীতীরের ভাঙন ঠেকাতে ফেলা হবে ২৫ লাখ জিওব্যাগ এবং নির্মাণ করা হবে ৪৫ লাখ ব্লক।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ১১ এপ্রিল প্রকল্পের কাজের উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার চারটি ইউনিয়ন দক্ষিণ উলানিয়া, চানপুর, মেহেন্দীগঞ্জ সদর ও শ্রীপুরে নদীতীর সংরক্ষণের কাজ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ২৯টি প্যাকেজ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন থেকে জনবসতি, কৃষিজমি, বসতভিটা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ সুরক্ষায় সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বরিশাল ও ভোলাকে সড়কপথে যুক্ত করতে প্রস্তাবিত সেতু নির্মাণের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ওই অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পথ সুগম হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
নৌপরিবহন ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান বলেন, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, নদীভাঙন রোধে নেওয়া অনেক প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ঠিকাদাররাও কাজ শুরু করেছেন। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, দুই বছরের মধ্যে এসব কাজ শেষ করার কথা থাকলেও আগামী বর্ষার আগেই এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করতে ঠিকাদারদের অনুরোধ জানিয়েছি। তারা চাইলে এ সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব। ঠিকাদাররাও বর্ষার আগেই কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, মেহেন্দীগঞ্জ, হিজলা ও কাজীরহাট থানার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন রোধে নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। আশা করি, সরকার আমাদের হতাশ করবে না। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে অবগত আছেন এবং নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, নদীভাঙন রোধে আমরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। এ বিষয়ে তিনি অত্যন্ত আন্তরিক। দেশের সামগ্রিক নদীব্যবস্থাপনা ও নদীভাঙন প্রতিরোধ নিয়ে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করেন। নদীভাঙনের সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে পানি সম্পদমন্ত্রীর সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি। আশা করছি, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

