কমিশন বৃদ্ধি, গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধসহ সাত দফা দাবিতে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজি গ্যাসের দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। দাবি পূরণ না হলে পরবর্তী সময়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য দোকান বন্ধ রাখারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. সেলিম খান।
তিনি জানান, আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা দেশের এলপিজি বিক্রির দোকান বন্ধ থাকবে। এ সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
ব্যবসায়ীদের প্রধান দাবি, সিলিন্ডারপ্রতি পরিবেশক কমিশন বর্তমান ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা। তাঁদের ভাষ্য, গত পাঁচ বছরে জ্বালানি তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, সিলিন্ডার ওঠানো-নামানোর খরচ, গুদামভাড়া ও লাইসেন্স ফি বেড়েছে। বর্তমান কমিশনে এসব ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়, কোম্পানি থেকে পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত একটি সিলিন্ডার আনতে প্রায় ৫০ টাকা খরচ হয়। সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো এবং খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে আরও ৩৫ টাকা ব্যয় হয়। কর্মচারীর বেতন, গুদামভাড়া, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচ ধরা হয়েছে ২৫ টাকা। এর সঙ্গে ৪০ টাকা মুনাফা যুক্ত করে সিলিন্ডারপ্রতি ১৫০ টাকা কমিশন দাবি করছেন তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে সেলিম খান অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করলেও কিছু কোম্পানি পাঁচ থেকে সাত দিন পর আবার দাম পরিবর্তন করে। এতে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। কোনো কোম্পানি মাসে একাধিকবার দাম সমন্বয় করতে চাইলে তা বিইআরসির ঘোষণার মাধ্যমে করার দাবি জানান তিনি।
এলপিজি সরবরাহের সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ব্যবসায়ী নেতারা। সেলিম খানের দাবি, বর্তমানে ছয় থেকে সাতটি কোম্পানি ছাড়া অধিকাংশ কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। ঋণপত্র খুলতে না পারায় অনেক কোম্পানির সিলিন্ডার অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এসব সিলিন্ডারে সরকারি উদ্যোগে অথবা অন্য কোম্পানির মাধ্যমে গ্যাস ভরে বাজারে সরবরাহের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
সিলিন্ডার পরিবহনে পুলিশের হয়রানির অভিযোগও করেন সমিতির সভাপতি। তাঁর দাবি, নিরাপত্তার কারণে পিকআপ ও ট্রাকে রেলিং রাখা প্রয়োজন। কিন্তু রেলিং থাকার কারণে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চান ব্যবসায়ীরা।
এ ছাড়া জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ব্যবসায়ীদের অযৌক্তিকভাবে জরিমানা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন সেলিম খান। এ ধরনের অভিযান বন্ধের দাবিও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীদের সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। কমিশন বৃদ্ধি ও গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি কোম্পানির চালানে সিলিন্ডারের প্রকৃত মূল্য উল্লেখ, পরিবেশকের গুদামে সিলিন্ডার পৌঁছে না দিলে ন্যায্য পরিবহনভাড়া প্রদান এবং দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহে অক্ষম কোম্পানির সিলিন্ডার পুনরায় গ্যাস ভরে বাজারজাত করার ব্যবস্থা করার দাবি রয়েছে তালিকায়। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে শুধু গাড়িতে রেলিং থাকার কারণে মামলা না দেওয়া এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে অযৌক্তিক জরিমানা বন্ধের দাবি জানানো হয়।
সেলিম খান জানান, সংবাদ সম্মেলন চলাকালে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ হয়েছে। চেয়ারম্যান দাবিগুলো পর্যালোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে এ বিষয়ে বিইআরসির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত ৮ জানুয়ারি প্রশাসনিক অভিযান ও জরিমানার প্রতিবাদে দেশজুড়ে এলপিজি সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রেখেছিলেন ব্যবসায়ীরা। পরে বিইআরসির সঙ্গে বৈঠক এবং দাবি পূরণের আশ্বাসে ওই দিন বিকেলে কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়।
এদিকে, এলপিজি বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখনো নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) দাবি করেছে, দেশে এলপিজির আমদানি ও সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষেও অবস্থান জানিয়েছে সংগঠনটি।


