ইউটিউবার, আর্য সমাজ আর খাপ পঞ্চায়েতের চাপে হরিয়ানার ভণ্ড ধর্মগুরুরা

ইউটিউবারদের প্রচারণা
ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতারাও। ছোট ভিডিও, গান ও জনসচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে তাঁরা স্বঘোষিত ধর্মগুরুদের অলৌকিক ক্ষমতা এবং অনুসারীদের অন্ধ আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
গুড়গাঁওয়ের কনটেন্ট নির্মাতা সুমিত বাজওয়া তাঁর ‘ক্যানসার ফ্রি ইন্ডিয়া’ প্রচারণার পাশাপাশি রামপাল ও তাঁর অনুসারীদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে ভিডিও তৈরি করেন। একটি ভিডিওতে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেউ সত্যিই ঈশ্বর হলে সমাজে ধর্ষণ ও অপরাধ বন্ধ করতে পারেন না কেন? হিন্দুদের ধর্মের নামে ভণ্ডামির বিরুদ্ধে জেগে ওঠার আহ্বানও জানান তিনি।

বাজওয়ার দাবি, ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করার পর তাঁর ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল এবং কিছু পোস্ট মুছে দেওয়া হয়।
সোনিপতের ৩৬ বছর বয়সী হর্ষ ছিকারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেক পরিচিত মুখ। তাঁর ফেসবুক অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৩১ লাখ। হর্ষ ছিকারা জনসেবা ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ করেন। ২০২৪ সালের হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচনে গোহানা আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
ছিকারার অভিযোগ, বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনামূলক ভিডিও প্রকাশের পর তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ভিডিওতে তিনি শাস্ত্রীর বিরুদ্ধে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য, অলৌকিকভাবে যেকোনো সমস্যা সমাধানের দাবির সত্যতা এবং ধর্মীয় প্রভাবকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছিলেন। বাগেশ্বর ধামের আশপাশে মেয়েরা নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগও তুলেছিলেন তিনি।
ধর্মেন্দ্র হুদার ডাক ও মণীষা হত্যার প্রশ্ন
হরিয়ানায় স্বঘোষিত ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে প্রচারণা প্রথম জোরালোভাবে শুরু করেন অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ধর্মেন্দ্র হুদা। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। ২০১৬ সালের জাট আন্দোলন এবং ২০২০ সালে দিল্লির উপকণ্ঠে কৃষক আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
গত ২৯ জুলাই এক ভিডিওতে তিনি স্বঘোষিত ধর্মগুরুদের উদ্দেশে ‘মনীষা হত্যার রহস্য’ উদ্ঘাটনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সত্যিই যদি তাঁদের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা থাকে, তাহলে সিবিআই যে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষ করতে পারেনি, সেটির অপরাধী শনাক্ত করে দেখান।
১৮ বছর বয়সী মণীষা গত বছরের আগস্টে হরিয়ানা রাজ্যের ভিওয়ানিতে নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন। দুই দিন পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি ঘিরে হরিয়ানাজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি পঞ্চকুলার একটি আদালত সিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে মামলাটির আরও তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
রোহতক জেলার মেহামের ‘মা চৌগান্নান’ ধামের এক ধর্মগুরুকে নিয়েও ভিডিও প্রকাশ করেন হুদা। তাঁর অভিযোগ, ওই ধর্মগুরু অনলাইনে আগাম বুকিং নিয়ে ভক্তদের সঙ্গে দেখা করেন এবং প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০টি ভূত তাড়ানোর দাবি করেন। হুদা তাঁকে এসব দাবি প্রকাশ্যে প্রমাণ করার আহ্বান জানান।
এর বিপরীতে ওই ধর্মগুরু পাল্টা একটি ভিডিওতে দাবি করেন, তিনি পাখণ্ডবাদের বিরুদ্ধে হুদার প্রচারণাকে সমর্থন করেন। তবে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নামে সত্যকে চাপা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলেও সতর্ক করেন।
হুদা জানান, প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে কথা বলায় তিনিও হুমকি পেয়েছেন। আশ্রম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও রাজনীতিকেরা তাঁকে সমালোচনা বন্ধ করতে এবং ক্ষমা চাইতে চাপ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে গান
বাবাদের বিরুদ্ধে এই প্রচারণা ছড়িয়ে পড়েছে গানেও। গায়ক মাসুম শর্মার গাওয়া এবং হ্যারি লাথারের লেখা ‘তত্ত্বদর্শী’ গানটিতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্বঘোষিত গুরুদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
গানটির কথায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ডেরা গড়ে উঠছে, অনেকেই গুরু সেজে বসছেন। কেউ ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত হয়েও ধর্মগ্রন্থের কথা বলছেন, আবার ভক্তদের মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অথচ তাঁদের আশ্রমে খাবারের আয়োজন চললেও বাড়িতে শিশুরা অভুক্ত থাকছে—এমন বৈপরীত্যও তুলে ধরা হয়েছে গানে।
হ্যারি লাথার জানান, ২০১৫ সালের নভেম্বরে গানটি লিখেছিলেন তিনি। তখন বাবাদের বিরুদ্ধে এখনকার মতো প্রচারণা শুরু হয়নি। এখন গানটির ইউটিউব ভিউ ১ কোটি ৬০ লাখ ছাড়িয়েছে এবং প্রায় তিন লাখ লাইক পেয়েছে। এমন জনপ্রিয়তার পর তাঁরা ‘তত্ত্বদর্শী ২’ প্রকাশ করেছেন।
মাসুম শর্মার ‘দ্য গ্রেট ওয়ারিয়র্স’ গানেও স্বঘোষিত ধর্মগুরুদের পূজা করার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। লাথারের মতে, মানুষ এসব ধর্মগুরুর কাছে যায় মূলত আর্থিক সহায়তা ও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানের আশায়। তাঁদের অনুসারীদের অনেকেই প্রভাবিত হয়ে পড়েন।
লাথারও অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার দাবি করেছেন। তবে তাঁর ভাষায়, এ ধরনের হুমকি এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার অনুসারীদের
রামপালের অনুসারীরা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের দাবি, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রচারণা ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চলছে। সমালোচকেরা তাঁদের ধর্মীয় রীতিনীতি যথাযথভাবে বোঝার চেষ্টা করেননি।
রামপালের দীর্ঘদিনের অনুসারী সুনীল কান্দেলা বারওয়ালা আশ্রমে দুধ দিয়ে গোসল করা এবং সেই দুধ দিয়ে ভক্তদের জন্য ক্ষীর তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, আশ্রমে ক্ষীর, লাড্ডু ও জিলাপিসহ খাবার বিনা মূল্যে পরিবেশন করা হতো। দুধ দিয়ে গোসলের অভিযোগকে তিনি ভিত্তিহীন আখ্যা দেন।
কান্দেলার ভাষ্য, রামপালের শিক্ষা বেদ ও কবিরের রচনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আশ্রমে বসবাস না করলে কাউকে অনুদান দিতে বলা হয় না। আর আশ্রমের বাসিন্দারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দেন। তিনি বলেন, হরিয়ানা, রাজস্থান, পাঞ্জাব ও মধ্যপ্রদেশে তাঁদের একাধিক আশ্রম রয়েছে। সেখানে হাজারো মানুষ অর্থের চিন্তা ছাড়াই খেতে ও থাকতে পারেন। জাতপাতের ভিত্তিতে কারও সঙ্গে বৈষম্য করা হয় না বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, স্বঘোষিত সাধ্বী কমলদীপের ডেরায় এখনো অসুস্থ মানুষের ভিড় অব্যাহত রয়েছে। রোগী ও স্বজনদের নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সও সেখানে আসছে। কমলদীপ ঝাড়ু হাতে রোগীর শরীরের ওপর তা ঘুরিয়ে দেন। ভক্তদের ভিড় বাড়ায় ডেরায় আচার-অনুষ্ঠানের সময়ও বাড়ানো হয়েছে। এখন শনিবার, রোববার ও মঙ্গলবার ‘ঝাড়া’ দেওয়ার অনুষ্ঠান চলে। তাঁর অলৌকিক চিকিৎসার দাবির সত্যতা নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীরা প্রশ্ন তুললেও কমলদীপের জবাব সংক্ষিপ্ত—‘সবকিছু ভগবান করেন।’

