চুয়াডাঙ্গায় দুই বিদ্যালয়ে এসএসসি টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ, একটিতে স্থগিত ও তদন্ত কমিটি

চুয়াডাঙ্গার দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চলমান এসএসসির নির্বাচনি (টেস্ট) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। জেলা শহরের চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রশ্ন বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়লে পরীক্ষা স্থগিত করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। অন্যদিকে, আলমডাঙ্গার একটি বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রের সঙ্গে স্থানীয় কোচিং সেন্টারের প্রশ্নের হুবহু মিল থাকায় পরীক্ষা বর্জন করে স্মারকলিপি দিয়েছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। সেখানে তথ্য সংগ্রহে গেলে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে ১৫০০ টাকায় প্রশ্ন বিক্রি, তদন্তে কমিটি
চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বাংলা প্রথম পত্রের নির্বাচনি পরীক্ষা ছিলো গত সোমবার। তবে আগের দিন রোববার রাতেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের ‘জনি ফটোকপি’ নামের একটি দোকান থেকে ওই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। শিক্ষার্থীদের কাছে প্রতিটি প্রশ্ন দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ পায়।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সহকারী কমিশনার মির্জা শহিদুল ইসলাম ওই দোকানে অভিযান চালান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অভিযানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সত্যতা মেলে। তবে প্রশ্নটি কীভাবে ফটোকপির দোকানে পৌঁছাল কিংবা কারা এই বাণিজ্যের নেপথ্যে রয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় সোমবার সকালের নির্ধারিত বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষাটি স্থগিত ঘোষণা করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
খবর পেয়ে বিদ্যালয় পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক ও পরিচালনা কমিটির সভাপতি লুৎফুন নাহার। তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করে ঘটনার বিস্তারিত জানেন এবং পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান।
ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এ.বি.এম. খালিদ হোসেন সিদ্দিকীকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গড়ে দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ রেজাউল করিম জানান, রোববার রাতে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর পরীক্ষা বন্ধ করা হয়। স্থগিত হওয়া এ পরীক্ষা আগামী শনিবার নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, প্রশ্ন ফাঁসে কারা জড়িত তা শনাক্তে কাজ চলছে এবং কোনো শিক্ষকের গাফিলতি বা সংশ্লিষ্টতা মিললে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আলমডাঙ্গায় কোচিংয়ের প্রশ্নের সঙ্গে হুবহু মিল, পরীক্ষা বর্জন
একই দিনে আলমডাঙ্গার পাইকপাড়া জনকল্যাণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি টেস্ট পরীক্ষায় ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে। সোমবার পরীক্ষার হলে প্রশ্ন হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীরা দেখতে পায়, গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার ‘পাইকপাড়া ওয়েলফেয়ার একাডেমি কেয়ার’ নামের একটি কোচিং সেন্টারে নেওয়া মডেল টেস্টের সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল রয়েছে।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষা বর্জন করে হল থেকে বেরিয়ে আসে। পরে তারা ওই কোচিং সেন্টারের সামনে মানববন্ধন করে প্রশ্ন ফাঁসের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের দাবি জানায়। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এর আগে পূজার ছুটির আগে অনুষ্ঠিত গণিত পরীক্ষার প্রশ্নের ক্ষেত্রেও ওই কোচিংয়ের প্রশ্নের ব্যাপক মিল পাওয়া গিয়েছিল। তারা পরীক্ষা বাতিল করে নতুন প্রশ্নে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। চলতি বছর বিদ্যালয়টির প্রায় ৭৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে আনুমানিক ৩০ জন ওই কোচিংয়ে পড়ে বলে জানা গেছে।
প্রশ্ন তৈরির বিষয়ে পাইকপাড়া জনকল্যাণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্ন তৈরি করেছিলেন বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষিকা আক্তার জাহান। তিনি পূজার ছুটির আগেই প্রশ্ন তৈরি করে জমা দেন। পরে অন্য একজন শিক্ষককে দিয়ে প্রশ্নটি কম্পোজ করিয়ে চূড়ান্ত করা হয়। কোচিং সেন্টারের প্রশ্নের সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রশ্ন হুবহু কীভাবে মিলে গেছে, তা বুঝতে পারছি না। সকালে শিক্ষার্থীদের হাতে প্রশ্নপত্র দেওয়ার পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী হল থেকে বের হয়ে আসে। তারা পরীক্ষা বাতিলের আবেদন করেছে।’
এদিকে বিষয় শিক্ষক আক্তার জাহান বলেন, ‘ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্ন তৈরির দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছিল। আমি পূজার ছুটির আগেই প্রশ্নপত্র তৈরি করে প্রধান শিক্ষকের কাছে জমা দিয়েছি। প্রশ্ন কীভাবে ফাঁস হলো, সে বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আমার দায়িত্ব ছিল প্রশ্ন তৈরি করে প্রধান শিক্ষকের কাছে জমা দেওয়া, আমি তা করেছি।’
কোচিং পরিচালকের দাবি ও সাংবাদিকদের হুমকি
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে পাইকপাড়া ওয়েলফেয়ার একাডেমি কেয়ারের পরিচালক নীলচাঁদ হোসেন দাবি করেন, তিনি কারও কাছ থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করেননি; গুগল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় নিজেই প্রশ্ন তৈরি করেছেন। তবে সাংবাদিকদের সামনে তিনি সেই প্রশ্ন তৈরির প্রক্রিয়া বা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন।
কথোপকথনের একপর্যায়ে নীলচাঁদ হোসেন তার ভাই পরিচয় দিয়ে রুজন আলী নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে সাংবাদিকদের ফোনে কথা বলিয়ে দেন। রুজন আলী নিজেকে ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘এলাকায় ঢুকেছেন কার অনুমতিতে, ওই প্রতিষ্ঠান আমার। আপনাদের এত সাহস হয় কীভাবে আমার প্রতিষ্ঠানে আসার, এরপর থেকে এলাকায় ঢুকলে আমার অনুমতি নিয়ে ঢুকবেন।’
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তার জানান, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে একটি স্মারকলিপি পাওয়া গেছে। মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই দিনে জেলার দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা ভঙ্গ হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের দাবি, নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্তের মাধ্যমেই পুরো প্রক্রিয়ার দুর্বলতা ও জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

