যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই, বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রে আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের দুই কক্ষ; প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে থাকবে, নাকি ডেমোক্র্যাটরা তা পুনরুদ্ধার করবেন। নির্বাচনের ফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের জন্য আগামী দুই বছর দেশ পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এই নির্বাচনকে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও নীতির প্রতি মার্কিন জনগণের সমর্থন যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি দুই বছর পরপর কংগ্রেস নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেটিই মধ্যবর্তী নির্বাচন নামে পরিচিত।
মার্কিন কংগ্রেসের দুটি কক্ষ রয়েছে; প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। দেশটির জন্য ফেডারেল আইন প্রণয়ন ও অনুমোদন করা কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ফলে নির্বাচনের মাধ্যমে কোন দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাচ্ছে, তার ওপর প্রেসিডেন্টের নীতিগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করে।
এ ছাড়া নির্বাচনের ফলের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্টের এ পর্যন্তকার কর্মকাণ্ড নিয়ে ভোটারদের সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির চিত্রও ফুটে ওঠে।
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে যেসব আসনে ভোট
এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই কক্ষের সদস্যরা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন। আইন প্রণয়নের প্রস্তাব উত্থাপন ও তা নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে প্রতিনিধি পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা এই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে পারবেন। প্রয়োজনে সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য তলব করার পাশাপাশি প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবেন।
অন্যদিকে সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে এবার ৩৫টিতে ভোট হবে। সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া বিল অনুমোদন বা আটকে দেওয়া ছাড়াও প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত ও ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগ অনুমোদনের দায়িত্ব রয়েছে সিনেটের। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই কক্ষের সম্মতি প্রয়োজন।
একই দিনে বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গভর্নরসহ রাজ্য পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও মিশিগানের নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।
নির্বাচনে প্রাধান্য পাচ্ছে যেসব ইস্যু
এবারের নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি অর্থনীতি। জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি করেছে। মূল্যস্ফীতিও এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য শুল্ক নীতি অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ করছে ডেমোক্র্যাটরা।
অভিবাসনও নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত বিষয়। রিপাবলিকানদের দাবি, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছেন। তবে এসব অভিযান নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক রয়েছে।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই দলের মধ্যে আলোচনা চলছে। উভয় দলের শীর্ষ নেতারা প্রযুক্তিটির জন্য আইনি কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও ট্রাম্প এআই খাতের বিকাশ নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়নের বিরোধিতা করছেন।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট; উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তবে দুই কক্ষেই তাদের ব্যবধান খুব বেশি নয়।
প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম আসনসংখ্যাও এটি। অন্যদিকে সিনেটে তাদের আসন ৫৩টি। ডেমোক্র্যাটরা ৫১টি আসন পেলে উচ্চকক্ষের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যাবে। কারণ দুই দলের আসনসংখ্যা সমান হলেও রিপাবলিকান ভাইস প্রেসিডেন্টের সমতা ভাঙার ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাসীন দলকে ভোটের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এবারও সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। সিলভার বুলেটিনের জরিপ-তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে তার প্রতি জনসমর্থন ৫০ শতাংশের বেশি থাকলেও অক্টোবরের শুরুতে তা কমে প্রায় ৩৭ শতাংশে নেমে আসে। বিপরীতে তার কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ৬১ শতাংশ মানুষ।
এদিকে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের বেশ কিছু আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বিবিসির যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অংশীদার সিবিএস নিউজ সিনেটের ১০টি এবং প্রতিনিধি পরিষদের ৪২টি আসনকে বিশেষ নজরদারিতে রেখেছে। আইওয়া, নিউ হ্যাম্পশায়ার, অ্যারিজোনা ও ওহাইওর আসনগুলো এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়েও দুই দলের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নিজেদের নির্বাচনী সুবিধা বাড়াতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট; উভয় পক্ষই নতুন নির্বাচনী মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করেছে। ফলে এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে কী চ্যালেঞ্জ আসতে পারে?
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন ও অভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তদন্ত করার সুযোগ পাবে বিরোধী দল।
দুর্নীতির অভিযোগ, হোয়াইট হাউসের প্রস্তাবিত নতুন বলরুম নির্মাণ এবং অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিইর কর্মকাণ্ড তদন্তের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পকে আবারও অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অভিশংসন মূলত প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপনের একটি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া।
তবে রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্পের জন্য নিজের নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কী প্রভাব পড়বে?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে কোনো প্রার্থী থাকেন না। তবে ট্রাম্প রিপাবলিকান ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, এই নির্বাচনকে তার নেতৃত্ব ও কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানানোর সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে।
নির্বাচনের ফল যে দলের পক্ষেই যাক, তা ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারবেন না।
ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে কারা সামনে আসবেন, তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হতে পারে। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হবে।
সব মিলিয়ে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের ভোট নয়; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদের রাজনৈতিক শক্তি, বিরোধী দলের নজরদারির ক্ষমতা এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

