বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিয়মিতভাবে লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে প্রতি মাসে দুটি করে লিভার প্রতিস্থাপন এবং বছরে মোট ২৪টি অস্ত্রোপচার করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী।
উপাচার্য জানান, বিএমইউতে এ পর্যন্ত ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এসব অস্ত্রোপচারের ব্যয় সরকারের তহবিল থেকে বহন করা হয়েছে। সরকারি সহায়তায় ২০২৭ সাল পর্যন্ত এ ধরনের অস্ত্রোপচার বিনামূল্যে করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
লিভার প্রতিস্থাপনের ব্যয়ের বিষয়ে অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে এ ধরনের চিকিৎসায় যেখানে প্রায় এক কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে, সেখানে বিএমইউতে তা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও কমিয়ে আনার চেষ্টা থাকবে।
তিনি জানান, বিএমইউতে প্রথম দফায় দুটি লিভার প্রতিস্থাপন করা হয় ২০২৫ সালের ১ ও ২ সেপ্টেম্বর। এরপর চলতি বছরের ৩ ও ৪ জুলাই এবং ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর আরও চারটি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। বর্তমানে এসব রোগী বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট ক্লিনিকের মাধ্যমে নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এদিকে আরও চারজন রোগীকে লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। আগামী ১০ থেকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে তাদের মধ্যে দুজনের অস্ত্রোপচার করার প্রস্তুতি চলছে।
বিএমইউ কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০১৯ ও ২০২৩ সালেও বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে লিভার প্রতিস্থাপন হয়েছিল। তবে তখন কার্যক্রমটি ধারাবাহিকভাবে চালু রাখা সম্ভব হয়নি। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার পর নিয়মিতভাবে এ কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
লিভার প্রতিস্থাপনে দাতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন উপাচার্য। তিনি বলেন, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনসংক্রান্ত আইন মেনে দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক, চিকিৎসাগত উপযুক্ততা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একাধিক ধাপে যাচাই করা হয়। হাসপাতালের নির্ধারিত বোর্ডও চূড়ান্তভাবে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে।
প্রয়োজনে দাতার পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করতে স্থানীয় চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর বা জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। এর মাধ্যমে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা অনিয়মের সুযোগ না রাখার চেষ্টা করা হয় বলে জানান তিনি।
মাসে দুটি লিভার প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক সিদ্দিকী বলেন, একটি ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য দাতা ও গ্রহীতা উভয়কেই দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুত করতে হয়। চিকিৎসাগত সামঞ্জস্য, আইনগত অনুমোদন, মানসিক প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছু সমন্বয় করেই একটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, লিভার প্রতিস্থাপনের মতো জটিল অস্ত্রোপচার কোনো একক চিকিৎসকের সাফল্য নয়। সার্জন, হেপাটোলজিস্ট, অ্যানেসথেটিস্ট, নার্স, রেসিডেন্ট চিকিৎসক ও ইনফেকশন কন্ট্রোল টিমসহ সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করার ফলেই এসব অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে।
বিএমইউ জানিয়েছে, ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি বিশেষায়িত বিভাগ যুক্ত ছিল। পাশাপাশি ভারতের হায়দ্রাবাদের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি (এআইজি) হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা কারিগরি সহায়তা দিয়েছেন।
সম্প্রতি বিএমইউতে লিভার প্রতিস্থাপন করা গৃহিণী জোৎসা বেগম বর্তমানে সুস্থ আছেন। তার ছেলে মো. সাজ্জাদ মাকে লিভারের অংশ দান করেন। সাজ্জাদ জানান, বাংলাদেশে এমন জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে করা সম্ভব—অপারেশনের আগে বিষয়টি তার কাছে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল। অস্ত্রোপচারের পর প্রায় এক মাস হাসপাতালে থাকার পর তার মা বর্তমানে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছেন।
ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে লিভার প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা তৈরিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন বিএমইউ উপাচার্য। তার ভাষ্য, দেশে লিভার প্রতিস্থাপনের চাহিদা রয়েছে। বিএমইউতে নিয়মিত এই চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হলে দেশের মানুষের মধ্যে দেশীয় চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে আস্থা আরও বাড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন অধ্যাপক ডা. বিধান চন্দ্র দাস, বিএমইউর অধ্যাপক ডা. সাইফ উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলমসহ ট্রান্সপ্ল্যান্ট কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বিএমইউতে মাসে দুটি লিভার প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা, খরচ ৩০-৩৫ লাখ টাকা
জাতীয় থেকে আরও পড়ুন


