একই পরীক্ষায় রোগীর খরচ কোথাও ৬৫৭, কোথাও ১৩০০

ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো বলছে, বেসরকারি হাসপাতালগুলো টিকে থাকে রোগ নির্ণয়ের ওপর। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় প্রত্যেককেই ন্যূনতম তিন থেকে পাঁচটি পরীক্ষা করাতে হয়। এগুলোর বড় অংশ আসে চিকিৎসকদের পরামর্শে।
সরেজমিনে ল্যাবএইড, পপুলার, ইবনে সিনাসহ ঢাকার অন্তত পাঁচটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে খোঁজ নেন এই প্রতিবেদক। ধানমন্ডির প্রথম সারির একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, টিএসএইচ পরীক্ষায় রি-এজেন্টে খরচ ৬০ টাকা। সহায়কসামগ্রীতে ৫০ টাকা। জনবল ও লজিস্টিক বাবদ সর্বোচ্চ ৫০ টাকা। সব মিলিয়ে খরচ ১৬০ টাকা। টিএসএইচ থাইরয়েড গ্রন্থির কাজ একটি হরমোন পরীক্ষা। ওই সেন্টারে লিপিড প্রোফাইলে খরচ ২৭৭ টাকা। হেপাটাইটিস (যকৃতের সংক্রমণ) নির্ণয়ে খরচ ১৯০ টাকা। অথচ খরচের তুলনায় অনেক বেশি বিল নেওয়া হয় রোগীদের কাছ থেকে।
সেন্টারভেদে টিএসএইচ পরীক্ষায় নেওয়া হচ্ছে ৬০০ থেকে ১৩০০ টাকা। লিপিড প্রোফাইলে নেওয়া হচ্ছে ৭৫০ থেকে ১৫০০ টাকা। হেপাটাইটিস পরীক্ষায় ৪৫০ থেকে ১২০০ টাকা।
ধানমন্ডির ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে লিপিড প্রোফাইলের দাম ১৩৯০ টাকা। পপুলারে তা ১০০০ ও ইবনে সিনায় ৮০৭ টাকা। হরমোনজাতীয় টিএসএইচ পরীক্ষায় ল্যাবএইডে ১৩০০, পপুলারে ৯০০ ও ইবনে সিনায় ৬৫৭ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
একেকটি পরীক্ষার পেছনে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব খরচ কেমন? ডায়াগনস্টিক সেন্টারভেদে বিলের পার্থক্য এত বেশি হওয়ার কারণ কী? এমন প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ল্যাবএইডের ধানমন্ডি শাখার একজন কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘হাসপাতালের জনবলের বেতন, রি-এজেন্টের দামসহ প্রতিটি খাত হিসাব করে পরীক্ষার দাম নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসকদের কমিশনের বিষয়টিও থাকে।’
ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একজন টেকনোলজিস্ট বলেন, ‘একই মানের হলেও আমরা ল্যাবএইড ও পপুলারের চেয়ে কম টাকা নিই। তারপরও যথেষ্ট মুনাফা থাকে।’
বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএইচসিডিএ) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন ল্যাবএইড হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ডা. এ এম শামীম। তার দাবি, সেবার মূল্য হঠাৎ বা উদ্দেশ্যহীনভাবে নির্ধারণ করা হয় না।
তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতালে মোট খরচের অন্তত ২৫ শতাংশ ব্যয় হয় রি-এজেন্টে। ডাক্তারদের কনসালটেন্সি ফি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ যায় প্রায় ৩০ শতাংশ। বাড়িভাড়া ও ইউটিলিটি বিলে আরও ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ খরচ হয়। এ ছাড়া ব্যাংক লোনের সুদ ও অন্যান্য ওভারহেড খরচে যায় আরও ৫ থেকে ৮ শতাংশ। এসব সামগ্রিক পরিচালনা ব্যয় হিসাব করার পর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ নিট মুনাফা ধরে সেবার মূল্য নির্ধারণ করা হয়।’
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মুনাফা নিয়ে গত বছর ঢাকার এক অনুষ্ঠানে কথা বলেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আপনারা প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন, তার যুক্তিসংগত মুনাফা দরকার। তবে সেটি যেন অন্যায়ের পর্যায়ে না যায়।’
দেশে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা খরচ বিদেশের উন্নত ও নামিদামি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক কম বলে মনে করেন এ এম শামীম। তার দাবি, ভারতের ম্যাক্স ও অ্যাপোলোতে ল্যাবএইডের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি খরচ। ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ ধার্য করে পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি ফি। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ ল্যাবএইডের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি ফি নেয়।

