বার থেকে বস্তি, তারপর তুরাগে শেষ পরিণতি

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন তথ্য ও প্রশ্ন। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ ও জেরিকা তাসনিম দিশার সঙ্গে ছিলেন তিনি। সেখান থেকে রাতের শেষভাগে তারা যান টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায়। এরপর ঘটে এমন একটি ঘটনা, যার শেষ পরিণতি তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে।
সিসিটিভি ফুটেজ, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ফরেনসিক পরীক্ষার বিভিন্ন তথ্য মিলিয়ে ওই রাতের ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। তবে এখনো স্পষ্ট নয়, বস্তি এলাকায় তাহসিফ কেন গিয়েছিলেন, সেখানে কারা তাদের ধাওয়া করেছিল এবং নদে পড়ার পর তার সঙ্গে কী ঘটেছিল।
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে প্রবেশ করেন তাহসিফ, দীপ ও দিশা। মোটরসাইকেলে করে সেখানে পৌঁছানোর পর তিনজনকে একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে ঢুকতে দেখা যায়।
রেস্টুরেন্টের আরেকটি ক্যামেরার ফুটেজে তাহসিফ ও দিশাকে লিফটের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে আসেন দীপ। পরে তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাদের রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে দেখা যায়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ওই রাতে তাহসিফ ১৬ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত ‘আল্ট্রা স্ট্রং’ চারটি বিয়ার পান করেন। তবে এতটা পান করার পরও তার মধ্যে দৃশ্যমান নেশার লক্ষণ ছিল না। সেদিন তাহসিফের মন ভালো ছিল না। তিনি বারে স্যাড মিউজিক বাজানোর অনুরোধ করেছিলেন। দিশার সঙ্গে অন্য এক তরুণের সময় কাটানো নিয়ে তার মধ্যে ক্ষোভ ছিল বলেও প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।
একটি সূত্রের দাবি, তাহসিফ ও দিশার মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। কোনো একটি বিষয় নিয়ে সেদিন তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। একপর্যায়ে তাহসিফ দিশাকে বলেন, ‘কাজটা তুমি ঠিক করোনি।’ তবে কী ঘটনার পর তাদের মধ্যে এমন কথোপকথন হয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের জেনারেল ম্যানেজার ও সাবেক মেরিটাইম ক্যাপ্টেন হাসান হাবিব জানান, তাহসিফ শেষবার রেস্টুরেন্টে যাওয়ার দিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি। তবে এর আগের তিন দিন তাহসিফ একই তরুণীকে নিয়ে সেখানে এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে দীপ ও দীপের সঙ্গে আরেক তরুণীও ছিলেন।
হাসান হাবিবের ভাষ্য, তারা গান শুনেছেন, নাচ করেছেন এবং সময় কাটিয়েছেন। আগের একদিন তাহসিফের সঙ্গে তার পরিচয় ও কথা হয়েছিল। তখন তাহসিফ নিজেকে ৭৭ লং কোর্সের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য গ্রুপে আন্ডারকভার হিসেবে কাজ করছেন বলে জানিয়েছিলেন।
বার থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ মোটরসাইকেলে করে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায় যান। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে তারা মাজার রোড দিয়ে বস্তি এলাকায় প্রবেশ করেন। অন্য একটি ফুটেজে দুজন করে আরোহী নিয়ে তিনটি মোটরসাইকেলকে একসঙ্গে বস্তিতে ঢুকতে দেখা যায়। এর মধ্যে প্রথম মোটরসাইকেলে ছিলেন তাহসিফ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তুরাগ নদসংলগ্ন ওই এলাকায় যাওয়ার পেছনে মাদক গ্রহণের বিষয়টিও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা রয়েছে এবং ইয়াবা ও হেরোইন সেবনের তথ্যও তদন্তে এসেছে। তবে তাহসিফ সেখানে গিয়ে কোনো মাদক গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মৃত্যুর আগে তিনি অ্যালকোহল বা অন্য কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা জানতে রক্ত, পাকস্থলী, কিডনি ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বস্তি এলাকায় অবস্থানের সময় তাহসিফ উচ্চস্বরে চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। একপর্যায়ে মাদকসংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে আসেন। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে কয়েকজন তাদের ধাওয়া করেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ধাওয়ার মুখে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। তিনি নিজে একটি পিলারের পাশে লুকিয়ে ছিলেন। পরে টহলরত পুলিশ সদস্যরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি তাহসিফের সঙ্গে সেখানে আসার কথা জানান।
দীপের দাবি, পুলিশ সদস্যরা তাকে দ্রুত সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। বস্তি থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে পেতে তার বেশ সময় লাগে। পরে মূল সড়কে উঠে তিনি মোহাম্মদপুরের বাসায় চলে যান।
তবে দীপের এ বক্তব্যের কয়েকটি দিক নিয়েই তদন্তকারীদের প্রশ্ন রয়েছে। তাহসিফ নদে ঝাঁপ দিলে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা না করে দীপ কেন সেখান থেকে চলে গেলেন, কারা তাদের ধাওয়া করেছিল এবং কী কারণে ধাওয়া করা হয়েছিল, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধাওয়া করা ব্যক্তিদের সঙ্গে তাহসিফ বা দীপের আগে কোনো পরিচয় বা বিরোধ ছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

