সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট
শিরোনাম
মজুরি বোর্ড গঠনের পরও অশান্ত শিল্পাঞ্চল, বন্ধ ৭০০ পোশাক কারখানাবিয়ের দাবিতে নয়, মানসিক সমস্যায় বিদ্যুতের টাওয়ারে উঠেছিলেন তুহিনঅনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত, অতিরিক্ত সচিবের দণ্ডহাতিয়ায় ৪ দোকানে তালা দিয়ে দখলে নিলেন স্বেচ্ছাসেবকদল নেতাফটিকছড়িতে ট্রাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, যুবক নিহত‘সরকারের ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনা দেশের অর্থনৈতিক সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে’পরীক্ষায় বহিষ্কারের পর বিদ্যালয়ে বোমা বিস্ফোরণের অভিযোগএনসিপির স্পোর্টস উইংয়ের আত্মপ্রকাশ, নেতৃত্বে ফাহিম-নাজমুলতামিমরা সক্ষম না বলে বিপিএল হচ্ছে না: আসিফ আকবরইসলামী আন্দোলন নেতার বিরুদ্ধে শতাধিক গাছ কাটার অভিযোগ
বিজ্ঞাপন

জামায়াত আমিরের এক্স হ্যাকের তদন্তে ডিভাইস চায় ডিবি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম
জামায়াত আমিরের এক্স হ্যাকের তদন্তে ডিভাইস চায় ডিবি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন জামায়াত

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাকের অভিযোগে করা মামলার তদন্ত আট মাসের বেশি সময়েও শেষ হয়নি। তদন্তের প্রয়োজনে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনসহ সংশ্লিষ্ট ডিভাইস চেয়ে বাদীপক্ষকে অন্তত তিনবার চিঠি দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আদালতের অনুমতি নিয়ে ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হলেও সেগুলো এখনো তদন্ত সংস্থার হাতে পৌঁছায়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সাইবার অপরাধের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে অ্যাকাউন্টে কখন, কোথা থেকে এবং কীভাবে প্রবেশ করা হয়েছে, সে সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকে। পাশাপাশি লগইন ও সেশন-সংক্রান্ত তথ্য, ম্যালওয়্যার কিংবা ফিশিংয়ের সম্ভাব্য আলামতও পরীক্ষা করা যায়। কিন্তু প্রয়োজনীয় ডিভাইস না পাওয়ায় তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

অন্যদিকে, জামায়াত আমিরের পক্ষে মামলার বাদী মো. সিরাজুল ইসলাম বলছেন, তাঁরা তদন্তে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানাননি। তবে ডিভাইসের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে ডিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুই দফা আলোচনা হয়েছে। নিজেদের উপস্থিতিতে ডিভাইস পরীক্ষা করার বিষয়েও তাঁরা প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

আদালতের অনুমতি, তবু মেলেনি ডিভাইস

মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম-দক্ষিণ ইউনিট। তদন্তের প্রয়োজনে বাদী সিরাজুল ইসলামের কাছে সংশ্লিষ্ট ডিভাইস ও অন্যান্য আলামত চেয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। এসব ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানানো হয়েছে।

সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হাফিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের অনুমতি নিয়ে বাদীপক্ষের কাছে অন্তত তিনবার চিঠি দিয়ে ডিভাইস ও প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয়েছে। তবে এখনো সেগুলো তদন্ত সংস্থার কাছে জমা দেওয়া হয়নি।

বাদীপক্ষকে সর্বশেষ কবে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং আদালত ঠিক কবে ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি এই কর্মকর্তা।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতি দেন আদালত। আগামী ৩ নভেম্বর মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।

ডিভাইসের নিরাপত্তা নিয়ে বাদীপক্ষের উদ্বেগের বিষয়ে তাঁদের কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে এডিসি হাফিজুল ইসলাম বাদীপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বাদীপক্ষ

মামলার বাদী মো. সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ডিবির চিঠি পাওয়ার পর তাঁরা দুইবার তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। তবে ডিভাইস দিতে অস্বীকৃতি জানানোর বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।

সিরাজুল ইসলামের ভাষ্য, ডিভাইস তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করলে সেগুলোর তথ্য ও নিরাপত্তা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, তা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনাও হয়েছে।

নিজেদের উপস্থিতিতে ডিভাইস পরীক্ষা করার প্রস্তাব দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, মামলার সময় তাঁরা নিজেদের অনুসন্ধানে পাওয়া কিছু নথিপত্র জমা দিয়েছিলেন। সরকারি মেইল বা সার্ভার ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো জায়গা থেকে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনার পক্ষে কিছু কাগজপত্রও তদন্তকারীদের দিয়েছেন তাঁরা।

তবে এসব নথির বিষয়ে তদন্ত সংস্থা কী পেয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

আসামির ডিভাইস পরীক্ষা, প্রতিবেদন আসেনি

বাদীপক্ষের ডিভাইস না পেলেও মামলার অন্যতম আসামি বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমের ব্যবহৃত মুঠোফোন, ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ জব্দ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার উদ্যোগ নেয় ডিবি। ছরওয়ারে আলমের দাবি, তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত কিছু ডিভাইসও জব্দ করা হয়েছিল। পরে প্রায় এক মাস পর সেগুলো ফেরত দেওয়া হয়।

জব্দ করা ডিভাইস থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা আলামত পাওয়া গেছে কি না, জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি। মামলার শুরুতে এক্স কর্তৃপক্ষের কাছেও বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকেও এখনো কোনো হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন ও তথ্য হাতে পাওয়ার পরই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে।

নিজেকে নির্দোষ দাবি ছরওয়ারের

মামলায় গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া ছরওয়ারে আলম শুরু থেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন। তাঁর বক্তব্য, শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের ঘটনায় তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তাঁর ব্যবহৃত ডিভাইস জব্দ করা হলেও এখন পর্যন্ত এই ঘটনার সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি। তবে তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফরেনসিক প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি।

ছরওয়ারে আলম প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াত আমিরের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ডিভাইস বারবার চাওয়া হলেও সেগুলো দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর মতে, ডিভাইসগুলো পরীক্ষার জন্য দেওয়া হলে এত দিনে ঘটনার সমাধান হওয়ার সুযোগ তৈরি হতো।

তিনি আরও বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়ায় তাঁকে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণিত হবে বলে আশা করছেন তিনি।

মামলার কারণে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর চাকরিতে ফিরতে না পারায় আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ছরওয়ারে আলম। তাঁর দাবি, চাকরির মেয়াদ শেষ হতে আর কয়েক মাস বাকি। তদন্ত দীর্ঘায়িত হলে পেনশনসহ চাকরিজীবনের বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাঁর।

নিজের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে চাকরিতে ফিরতে পারেননি। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে এ ঘটনায় বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে।

যে পোস্ট ঘিরে মামলা

চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ইংরেজিতে একটি পোস্ট প্রকাশ করা হয়। পোস্টের একটি অংশে নারীদের আধুনিকতার নামে ঘরের বাইরে আনা এবং এর সঙ্গে শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তাহীনতার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য ছিল।

পোস্টটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপিসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই মন্তব্য কর্মজীবী নারীদের অবমাননা করেছে।

এরপর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সরকারি মেইল ব্যবহার করে দলের আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে পোস্টটি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় প্রথমে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরে মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমসহ অজ্ঞাতনামা ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়।

৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ছরওয়ারে আলমকে আটক করে ডিবি। এ সময় তাঁর মুঠোফোন ও ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। পরদিন তাঁকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানায় ডিবি। তবে সেদিনই আদালত থেকে জামিন পান তিনি।

দ্রুত তদন্ত শেষ করার তাগিদ

তদন্তে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাদী ও বিবাদী—উভয় পক্ষের সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি ওমর ফারুক ফারুকী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে তদন্ত কর্মকর্তাকে সহযোগিতা করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

অ্যাকাউন্ট হ্যাকের অভিযোগ ওঠার আট মাসের বেশি সময় পরও সংশ্লিষ্ট ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি। এক্স কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অ্যাকাউন্টে সত্যিই অননুমোদিত প্রবেশ ঘটেছিল কি না, ঘটলে কীভাবে ঘটেছিল এবং এর সঙ্গে ছরওয়ারে আলমের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

আগামী ৩ নভেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ নির্ধারিত থাকায় এর আগে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষার কাজ কতটা এগোয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...