‘ভাত লাগলে ভাত নে, আমার ভাইরে ফেরত দে’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’—এমন স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠেছে খুলনা নগরী। চুয়াডাঙ্গার সদর উপজেলার বড়শলুয়া গ্রামের তরুণ মো. আজমুল হোসেনকে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
সোমবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে নগরীর এম এ বারী সড়ক ও সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচি শুরু করেন। পরে নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থীরাও এতে যোগ দেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলা কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।
‘এক লোকমা ভাতের তরে মায়ের বুক খালি করে, আজমুল হত্যার বিচার চাই’ এবং ‘আমার ভাই মরল কেন, জবাব চাই’—এমন লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে শিক্ষার্থীরা হত্যার প্রতিবাদ জানান। অবরোধের কারণে সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে জরুরি সেবার কথা বিবেচনা করে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের জন্য শিক্ষার্থীরা সড়কে জায়গা করে দেন।
নিহত আজমুল হোসেন (২১) চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বড়শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিনের ছেলে। তিনি খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
মেসে ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ
স্থানীয় বাসিন্দা ও মেসের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় এক বছর ধরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খানজাহান আলী হলের বিপরীতে ইসলামনগর মসজিদ গলির একটি চারতলা ভবনের মেসে থাকতেন আজমুল।
গত শুক্রবার রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে মেসের ম্যানেজার মেহেদীর খাবার খাওয়াকে কেন্দ্র করে আজমুলের বিরুদ্ধে ভাত চুরির অভিযোগ তোলা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও বাইরে থেকে আসা কয়েকজন তাকে চারতলার ছাদে নিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরে গভীর রাতে ছাদ থেকে নিচে ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পান আশপাশের বাসিন্দারা। গলিতে রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় আজমুলকে পড়ে থাকতে দেখে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, পরিবার থেকে দূরে থেকে পড়াশোনা করতে আসা একজন তরুণকে এভাবে প্রাণ হারাতে হয়েছে—এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একটি প্লেট ভাতের মতো সামান্য একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে একজন শিক্ষার্থীর জীবন চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তাদের ভাষ্য, মেস ও ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। আজমুল হত্যার ঘটনায় জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানান। তারা বলেন, তুচ্ছ কোনো অভিযোগকে কেন্দ্র করে কাউকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
৭২ ঘণ্টা পরও গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ
বিক্ষোভে বক্তব্য দিতে গিয়ে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কানাই লাল সরকার বলেন, আজমুলের বিরুদ্ধে ভাত চুরির অভিযোগ তোলা হয়েছিল। তার শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং মারধরের পর তাকে চারতলার ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
ঘটনার ৬০ থেকে ৭২ ঘণ্টা পার হলেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দ্রুত তদন্ত শেষ করে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়া এবং জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান তিনি।
প্রশাসনের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের খবর পেয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানান এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দেন।
পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন বা অভিযোগপত্র দাখিলের আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর বেলা দেড়টার দিকে শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করেন।
মামলা, আসামি ধরতে অভিযান
আজমুল হোসেন হত্যার ঘটনায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন চিহ্নিত শিক্ষার্থীসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করে সংশ্লিষ্ট থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে।
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন বলেন, এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাত আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করে অভিযান চালানো হচ্ছে। যাতে প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসে এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।


