লোগো
Advertisement

পথশিশুদের নীরব ঘাতক ‘ড্যান্ডি’, নেশার জালে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব

নিজস্ব প্রতিবেদক ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪০ পিএম
Advertisement

ঢাকার কেরানীগঞ্জের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা নদী। নদীর বেড়িবাঁধ ঘেঁষে একটি ছোট ছাউনি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে পরিত্যক্ত কোনো জায়গায় বানানো অস্থায়ী আশ্রয়। অথচ সন্ধ্যা নামলেই সেখানে ফিরতে শুরু করে ১০ থেকে ১৫ জন শিশু।

দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ভাঙারি সংগ্রহ করে তারা। কারও হাতে থাকে প্লাস্টিক, কারও হাতে লোহার টুকরা কিংবা ফেলে দেওয়া বিভিন্ন সামগ্রী। এসব বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে তাদের জীবন।

তবে সন্ধ্যার পর এই শিশুদের জীবনে নেমে আসে আরও ভয়াবহ এক বাস্তবতা।

ছাউনিতে ফিরে কয়েকজন শিশুকে পলিথিনের ভেতর মুখ ঢুকিয়ে কিছু একটা গ্রহণ করতে দেখা যায়। বিষয়টি জানতে আসাদ নামের এক শিশুর সঙ্গে কথা বললে সে জানায়, ছোটবেলায় বন্ধুদের কাছ থেকে সিগারেট নিয়ে খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয় তার। পরে গাঁজা ও ফেনসিডিলেও জড়িয়ে পড়ে। এখন নিয়মিত ‘ড্যান্ডি’ গ্রহণ করে সে।

আসাদের ভাষায়, ‘ড্যান্ডি লইতে লইতে জীবনটা প্লাস্টিক হইয়্যা গেল।’

শিশুটির কথাতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, পলিথিনের ভেতর নেওয়া ওই পদার্থটি কোনো সাধারণ জিনিস নয়। এটি এক ধরনের নেশা—যার নাম ‘ড্যান্ডি’।

সস্তা আঠা থেকেই ভয়ংকর নেশা

ড্যান্ডি মূলত এক ধরনের আঠালো সলিউশন। এতে টলুইন নামের রাসায়নিক উপাদান থাকে। জুতা তৈরির কাজে এবং রিকশার টায়ার-টিউব জোড়া লাগাতেও এ ধরনের আঠা ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু এই সলিউশন পলিথিনের মধ্যে রেখে এর গন্ধ নাক-মুখ দিয়ে গ্রহণ করলে শরীরে নেশাজাতীয় প্রভাব তৈরি হয়। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত ও পথেঘাটে থাকা শিশুদের মধ্যে এটি সহজলভ্য এবং তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় ব্যবহার বাড়ছে।

নেশার প্রভাবে কিছু সময়ের জন্য ক্ষুধা, ক্লান্তি কিংবা শরীরের ব্যথা-যন্ত্রণা কম অনুভূত হয়। কিন্তু নিয়মিত ব্যবহারে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শুধু শারীরিক ক্ষতিই নয়, মাদকের কারণে এসব শিশুর পড়াশোনা, স্বাভাবিক সামাজিক জীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

৫৮ শতাংশ পথশিশু মাদকে আসক্ত

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের প্রায় ৫৮ শতাংশ পথশিশু কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে ১৪ শতাংশ শিশু ১০ বছর বয়সের আগেই মাদক গ্রহণ শুরু করে।

সহজলভ্যতা ও কম দামের কারণে পথশিশুদের মধ্যে গাঁজার ব্যবহার তুলনামূলক বেশি। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ পথশিশু গাঁজা সেবন করে। আর ড্যান্ডিতে আসক্ত শিশুর হার ১৫ দশমিক ২ শতাংশ।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ড্যান্ডিতে আসক্ত পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার।

এদিকে দেশে বিভিন্নভাবে মাদকের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা ৭০ লাখের বেশি বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্তে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ। প্রায় ৮০ শতাংশ মাদকাসক্ত কিশোর কিংবা তরুণ বয়সী বলে তথ্যটিতে উঠে এসেছে।

সীমান্ত পেরিয়ে ছড়াচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মাদক

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদকের ধরন ও চাহিদার ভিন্নতাও উঠে এসেছে।

উত্তর-পূর্ব সীমান্তবর্তী জেলা এবং ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তসংলগ্ন এলাকাগুলোতে ফেনসিডিলের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী জেলাগুলোতে ইয়াবার চাহিদা রয়েছে।

রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের ব্যবহার ও চাহিদা রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো থেকে এসব শহরে মাদক সরবরাহের একটি বড় অংশ পৌঁছায় বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবার ও সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

শিশুদের মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশেরও বড় ভূমিকা রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশু কিংবা পরিবার ও সমাজে নির্যাতন, অবহেলা ও লাঞ্ছনার শিকার শিশুরা পরবর্তীতে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানদের সঙ্গে অভিভাবকদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। মাদকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, স্কুল বা এলাকার বন্ধু কারা—এসব বিষয়েও অভিভাবকদের নজর রাখা প্রয়োজন।

শুধু নিষেধ করলেই হবে না; কেন মাদক ক্ষতিকর, কীভাবে এর আসক্তি জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে—সেটিও সন্তানদের বোঝাতে হবে।

প্রয়োজন পুনর্বাসন ও সামাজিক উদ্যোগ

মাদকাসক্ত শিশুকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। এজন্য প্রয়োজন পরিবারের সহযোগিতা, চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং নিরাপদ পরিবেশ।

অভিভাবকহীন কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে দায়িত্ব আরও বেশি। তাদের পুনর্বাসনে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, সামাজিক সংগঠন ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে।

প্রতি বছর ২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস পালিত হয়। ১৯৮৮ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বন্ধে জনসচেতনতা বাড়ানো, মাদকবিরোধী শিক্ষা এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর এ দিবসে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তবে একটি দিবসের আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বিশেষ করে পথশিশুদের ক্ষেত্রে মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে তাদের নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বুড়িগঙ্গার পাড়ের সেই ছোট ছাউনিতে থাকা আসাদদের গল্প শুধু কয়েকজন শিশুর গল্প নয়। এটি সমাজের একটি বড় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যে বয়সে বই-খাতা হাতে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে কোনো কোনো শিশু ভাঙারি কুড়িয়ে দিন কাটাচ্ছে, আর সন্ধ্যায় সস্তা নেশার কাছে হারিয়ে ফেলছে নিজের ভবিষ্যৎ।

সময়মতো তাদের পাশে দাঁড়ানো না গেলে ‘ড্যান্ডি’র মতো সস্তা নেশা কেড়ে নিতে পারে আরও অনেক শিশুর শৈশব ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।

আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...