রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট
শিরোনাম
বরিশাল শিক্ষা বোর্ড: তিন কারণে ফল বিপর্যয়আজকের নামাজের সময়সূচি: ০১ নভেম্বর ২০২৬সাজেকে আবারও অবরোধ ঘোষণালংমার্চে সীমিত অংশগ্রহণ: জোটে থেকেও এনসিপির নিজের রাজনীতিতে জোরকল্যাণপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মশাল মিছিলসন্ধ্যার পর অকারণে বাইরে ঘুরলে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তারের হুঁশিয়ারি ডিআইজিরতফসিলের আগেই নেহালপুরে ভোটের হাওয়া: পাড়া-মহল্লা ছাপিয়ে ফেসবুকে সরব সম্ভাব্য প্রার্থীরাসাত দফা মেনে নিলে, এক দফার প্রয়োজন হবে না: সমাপনী বক্তব্যে জামায়াত আমিরযশোরে অস্ট্রেলীয় নাগরিকের ব্যাগ ছিনতাইচেষ্টার অভিযোগে যুবক আটকনেহালপুর ইউপি নির্বাচন: তফসিলের আগেই মাঠ ও ফেসবুকে সরব প্রার্থীরা
বিজ্ঞাপন

৩৪ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারাজ, পাল্টে যাবে ১৯ জেলার চিত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৯ এএম
৩৪ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারাজ, পাল্টে যাবে ১৯ জেলার চিত্র

পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি এবং সেচব্যবস্থায় প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। শুষ্ক মৌসুমে নদী ও সেচ প্রকল্পে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা গেলে কৃষিকাজে পানির সংকট মোকাবিলা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্য পাঁচ নদী ব্যবস্থা

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য পাঁচটি নদী ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করা। এগুলো হলো হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থা।

প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে এসব নদী ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গোদাগাড়ি পাম্প হাউস, গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী ব্যবস্থায় প্রতি সেকেন্ডে ন্যূনতম ২৩৯ ঘনমিটার, গড়াই-মধুমতিতে ২৩০ ঘনমিটার, চন্দনা-বারাশিয়ায় ৮০ ঘনমিটার, বড়ালে ২২ ঘনমিটার এবং ইছামতি নদী ব্যবস্থায় ২৫ ঘনমিটার পানি সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া গোদাগাড়ি পাম্প হাউসে প্রতি সেকেন্ডে ৬৪ ঘনমিটার, জিকে সেচ প্রকল্পে ১৩৬ ঘনমিটার এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩ ঘনমিটার পানি সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ বজায় রাখা, কৃষিতে সেচের পানির জোগান এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের পরিকল্পনা

প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য কৃষিতে সেচের পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। প্রকল্পের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর নিট চাষযোগ্য জমিতে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানির সংস্থান নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব অঞ্চলে মোট চাষযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৪৬ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকট মোকাবিলা, ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সুফল নির্ভর করবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, পানির সুষ্ঠু বণ্টন এবং সংশ্লিষ্ট নদী ও সেচ অবকাঠামোর কার্যকারিতার ওপর।

পাবনার সুজানগরে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প পরিদর্শন ও কারিগরি সভায় মানচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
পাবনার সুজানগরে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প পরিদর্শন ও কারিগরি সভায় মানচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রায় কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ রয়েছে। এতে বছরে প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান এবং ২ লাখ ৩৪ হাজার টন অতিরিক্ত মৎস্য উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হয়েছে।

কমতে পারে লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ কমানো প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য। পাশাপাশি সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ সংরক্ষণে স্বাদু পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো থেকে পলি অপসারণ ও নদী ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে যশোরের ভবদহসহ বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পদ্মানির্ভর এলাকার নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে আর্সেনিক দূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে প্রকল্পের সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে নদী পুনরুজ্জীবন, লবণাক্ততা হ্রাস ও জলাবদ্ধতা নিরসনের সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের নকশা, পানির প্রবাহ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।

ব্যারাজ নির্মাণে ড্রেজিং হবে ১৩৫ কিলোমিটার নদী

প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে পদ্মা ব্যারাজ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ। এর মধ্যে স্পিলওয়ে, আন্ডারগেট, মাছ চলাচলের পথ, নৌযান চলাচলের লক, গাইড বাঁধ ও সংযোগ বাঁধ রয়েছে।

এ ছাড়া গড়াই নদীর উৎসমুখে বা অফটেকে অবকাঠামো নির্মাণ, চন্দনা ও হিসনা নদীর অফটেক অবকাঠামো স্থাপন, গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থায় ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং, হিসনা নদী ব্যবস্থায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার নিষ্কাশন খাল পুনঃখনন এবং ১৮০ কিলোমিটার এফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ব্যারাজের দৈর্ঘ্য হবে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। এতে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডারগেট, একটি নেভিগেশন লক এবং দুটি ফিশ পাস রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চারটি টারবাইন স্থাপনের কথাও বলা হয়েছে।

তবে প্রকল্পের সারসংক্ষেপে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে দুটি ভিন্ন পরিসংখ্যান রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার অংশে আনুমানিক ১১৩ মেগাওয়াট উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ব্যারাজের সংক্ষিপ্ত বিবরণে চারটি টারবাইনের মোট উৎপাদনক্ষমতা ৭৬ দশমিক ৪০ মেগাওয়াট উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রকল্পের চূড়ান্ত নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

সাতটি স্যাটেলাইট শহর ও ৯ লাখ কর্মসংস্থান

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের পরিকল্পনায় শুধু পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নয়, ভূমি উন্নয়ন ও নগরায়ণের বিষয়ও রয়েছে। প্রকল্পের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সাতটি স্যাটেলাইট শহর প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৩ হাজার ৪৫০ একর এলাকায় প্রায় দেড় লাখ পরিবারের জন্য আধুনিক নগর সুবিধাসম্পন্ন গ্রামীণ জনপদ বা রুরাল টাউনশিপ গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। ব্যারেজের ওপর দিয়ে সড়ক সংযোগ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপনের সম্ভাবনাও প্রকল্পের পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও সারসংক্ষেপে উল্লেখ রয়েছে।

প্রকল্পের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরকে ভিত্তি বছর ধরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য হিসেবে ২৪ হাজার ৮৫১ কোটি ৪৩ লাখ টাকার উল্লেখ রয়েছে। প্রকল্পের সারসংক্ষেপে প্রত্যক্ষ সুফলের প্রভাব শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং পরোক্ষ সুফলের প্রভাব শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ বলা হয়েছে।

এ ছাড়া বছরে আনুমানিক ৮ হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যান প্রকল্পের প্রাক্কলিত লক্ষ্য ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের অংশ। বাস্তবে সুফল অর্জনের মাত্রা নির্ভর করবে ব্যয়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি, পানির প্রাপ্যতা এবং প্রকল্প-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার ওপর।

সব মিলিয়ে পদ্মা ব্যারাজের প্রথম পর্যায় বাস্তবায়িত হলে কৃষি, সেচ, নদী ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এ প্রকল্পের সুফল পেতে সময়মতো বাস্তবায়ন, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, স্বচ্ছ ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং নদীভিত্তিক পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সারাদেশ থেকে আরও পড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...