আমি কখনো চাইনি আমার বাচ্চা ফার্মের মুরগির মতো বড় হোক। একটা বাক্সের মধ্যে বড় হবে, বাইরে বের হবে, আবার বাক্সে ঢুকে যাবে—এটা আমি চাইনি।’
এভাবেই একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে বড় করার স্বপ্নের কথা বলছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সন্তান হারানোর শোকের মধ্যেও ছেলের বেড়ে ওঠার নানা স্মৃতি তুলে ধরেন তিনি।
অপ্রতিমকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানানোর কোনো লক্ষ্য ছিল না বলে জানান তার মা। বরং ছেলে যেন নিজের কাজ নিজে করতে শেখে, স্বাধীনভাবে চলতে পারে এবং দেশ-বিদেশ ঘুরে পৃথিবীকে নিজের চোখে চিনতে পারে—এটাই ছিল তার চাওয়া।
ছেলেকে নানা ধরনের কাজে যুক্ত করেছিলেন নাহিদা বেগম। অপ্রতিম ফটোগ্রাফি, সাইক্লিং ও সাঁতার শিখেছিল। কারাতের প্রশিক্ষণও নিয়েছিল। এক বছর নাচ শেখার পাশাপাশি হারমোনিয়ামও বাজাত সে। ছেলের ব্যবহৃত সেই হারমোনিয়াম এখনো ঘরে পড়ে আছে।
নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমি চেয়েছি আমার ছেলে প্রত্যেকটা কাজে সেলফ ডিপেন্ডেন্ট হবে। কোন সবজি কোনটা, কোন পেশা কোনটা—সে নিজে নিজে চিনুক। আমি চেয়েছি আমার ছেলে সারা দুনিয়া ঘুরে ঘুরে পৃথিবীকে চিনুক।’
ছেলের স্বভাবের কথাও স্মরণ করেন তিনি। তার ভাষ্য, অপ্রতিম খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারত। বয়স বা সম্পর্কের পার্থক্য না করে সবাইকে আপন করে নিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই তাকে কোলে তুলে নিয়েছেন। তাই অপ্রতিমের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই ছিলেন ‘ভাইয়া’।
সন্তানকে বড় করার নিজের পদ্ধতি নিয়েও আত্মসমালোচনার কথা বলেন নাহিদা বেগম। তিনি বলেন, ‘এটা আমার ভুল হতে পারে। আমার এই প্যারেন্টিং যদি ভুল হয়, আমি মাফ চাই।’
তবে নিজের শোকের মধ্যেও অন্য অভিভাবকদের প্রতি সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সন্তানকে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সে কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কী করছে—এসব বিষয়েও অভিভাবকদের নজর রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
একদিকে সন্তানের স্বাধীন বিকাশের স্বপ্ন, অন্যদিকে তাকে হারানোর বেদনা—দুইয়ের মাঝেই অপ্রতিমকে ঘিরে মায়ের স্মৃতিচারণে উঠে আসে একজন সন্তানের জন্য একজন মায়ের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও ভালোবাসার গল্প।


