সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট
শিরোনাম
বিজ্ঞাপন

জ্ঞানেশ কুমার ও মোদি-শাহের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক ‘ইন্ডিয়া’ জোটের

নিজস্ব প্রতিবেদক০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৬ পিএম
জ্ঞানেশ কুমার ও মোদি-শাহের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক ‘ইন্ডিয়া’ জোটের

বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশজুড়ে কোটি কোটি বৈধ ভোটারের নাম বাদ দিয়ে ‘ভোট চুরি’ করার গুরুতর অভিযোগ তুলে রোববার (১ নভেম্বর) দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে আছড়ে পড়ল বিরোধী দলগুলোর ক্ষোভ।

বিজেপিবিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আয়োজিত ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ শীর্ষক এই মহাসমাবেশ থেকে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ এবং বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধের মূল দাবি তোলা হয়। সমাবেশ থেকে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিচার এবং গ্রেপ্তারের হুঁশিয়ারি দেওয়ায় জাতীয় রাজনীতিতে পারদ চড়েছে।

শনিবার রাত থেকেই সমর্থকদের ভীর আছড়ে পড়ে দিল্লিতে। রোববার সকাল হতেই ভিড়ের পরিমাণ আরো বাড়তে থাকে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা এই সুদীর্ঘ মহাসমাবেশে দিল্লির রাজপথ কার্যত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পতাকা ও ভারতের জাতীয় পতাকায় ছেয়ে যায়।

এই বিশাল সমাবেশ থেকে বিরোধী ঐক্যের এক জমাট চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, সংসদীয় দলের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব, সিপিআই(এম)-এর সর্বভারতীয় সম্পাদক এম. এ. বেবি, ন্যাশনাল কনফারেন্সের ফারুক আব্দুল্লাহ, পিডিপি সভাপতি মেহবুবা মুফতি, শিবসেনার (উদ্ধব গোষ্ঠী) সাংসদ সঞ্জয় রাউত এবং এনসিপির সুপ্রিয়া সুলের মতো হেভিওয়েট নেতারা এক মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। তবে বিরোধী জোটকে বাইরে থেকে সমর্থন জানানো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র কোনো প্রতিনিধিকে সভামঞ্চে দেখা যায়নি।

মহাসমাবেশে লাখো সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সরাসরি মোদি সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় তোলেন রাহুল গান্ধী। ভোটার তালিকা থেকে বেছে বেছে ভোটারের নাম ছেঁটে ফেলাকে সাধারণ ত্রুটি না বলে ‘দেশবিরোধী’ ও ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ কাজ বলে তোপ দেগে তিনি দাবি করেন, জ্ঞানেশ কুমার কোনো স্বাধীন নির্বাচন কমিশনার নন, তিনি নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহকে ক্ষমতায় রাখার একটি মাধ্যম মাত্র। তাই তাকে ইস্তফা দিয়ে জেলে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে রাহুল জানান, জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের পর তাদের বিরুদ্ধেও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং তারা দেশ ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যেতে পারবেন না।

এর পাশাপাশি কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কারচুপি, কোটি কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, সংসদকে না জানিয়ে ৬ নম্বর ফর্মের পুনর্বিন্যাস, ECINET-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকার কেন্দ্রীকরণ, commissions-এর অন্য দুই সদস্যকে পাশ কাটানো এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে কাজ করার মতো ৬টি নির্দিষ্ট অভিযোগের দলিল তুলে ধরেন। তিনি সিইসির ইস্তফা, এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল ও ২০২৩ সালের বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইন সংশোধনের ৩টি মূল দাবি জানান। এই মঞ্চ থেকেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি দাবি করেন, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। বিজেপি বাংলা লুট করেছে, আর বিরোধীরা এবার দিল্লির বুক থেকে গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠা করবে। একই সঙ্গে অখিলেশ যাদব ও তেজস্বী যাদব উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ এনে বিজেপি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ডাক দেন।

অন্যদিকে, দিল্লিতে বিরোধীদের এই সমাবেশের জবাবে বিজেপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন রাজ্যে পাল্টা ‘গণতন্ত্র বাঁচান, নৈরাজ্য দূর করুন’ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সিমলার সমাবেশ থেকে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দাবি করেন, সুপ্রিম কোর্ট ও সংসদ স্বীকার করেছে যে অবৈধ অনুপ্রবেশ দেশের মূল সমস্যা, আর সরকার যখন ভোটার তালিকা পরিচ্ছন্ন করছে তখন বিরোধীরা অনুপ্রবেশকারীদের আড়াল করতেই এই নাটক ফাঁদছে।

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি জে পি নাড্ডা বিরোধীদের এই আন্দোলনকে ‘মেলোড্রামা’ বা অতি-নাটকীয়তা আখ্যা দিয়ে একে গণতন্ত্রের প্রতি চরম অসম্মান ও নৈরাজ্য সৃষ্টির চক্রান্ত বলে কটাক্ষ করেন।

পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ঠাকুরনগরে মতুয়া সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে অভিযোগ তোলেন, মাওবাদী, আরশোলা ও দেশবিরোধী শক্তি একসঙ্গে মিলে বাংলাদেশে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির মতো ভারতেও অস্থিরতা তৈরি করতে চাইছে।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে এত বড় মাপের বিরোধী আন্দোলন আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান খবরের শিরোনামে চলে এসেছে। রামলীলা ময়দানের সমাবেশ থেকে বিরোধী নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই লড়াই কেবল পথসভায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সংসদের আসন্ন অধিবেশনে এবং আইনি লড়াইয়ে এই ইস্যুতে মোদি সরকারকে আরও তীব্রভাবে কোণঠাসা করা হবে।

আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...