ভ্যাপসা গরম, আবার কখনো হঠাৎ বৃষ্টিআবহাওয়ার এমন বৈরী আচরণ ও দ্রুত পালাবদলের প্রভাব পড়েছে শিশুদের স্বাস্থ্যে। চুয়াডাঙ্গায় ঘরে ঘরে বাড়ছে নানা রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। বিশেষ করে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক অসুস্থ শিশু নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন অভিভাবকরা।
রোগীর বাড়তি চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা। হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগ দুই জায়গাতেই বেড়েছে শিশু রোগীর চাপ।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. মাহবুবুর রহমান মিলন জানান, বর্তমানে প্রতিদিন বহির্বিভাগে দুই শতাধিক শিশু রোগী চিকিৎসা নিতে আসছে। পাশাপাশি আন্তঃবিভাগে ভর্তি রয়েছে ১২০ থেকে ১৩০ জনের মতো শিশু।
হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ডা. মিলন বলেন, “আমাদের এখানে মাত্র দুজন কনসালট্যান্ট কর্মরত আছেন। প্রতিদিন আউটডোরে আমাদের ২০০-এর বেশি শিশু রোগী দেখতে হচ্ছে। অন্যদিকে ইনডোরে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৩০ জন শিশু ভর্তি থাকছে। এত বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের বড় একটি অংশ নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত বলে জানান তিনি। এছাড়া বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের মধ্যে সর্দি, কাশি, অ্যাজমা, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার উপসর্গ বেশি দেখা যাচ্ছে।
আবহাওয়ার পরিবর্তনেই বাড়ছে সংক্রমণ
শিশুদের মধ্যে হঠাৎ করে এসব রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পেছনে আবহাওয়ার পরিবর্তনকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন এই শিশু বিশেষজ্ঞ।
ডা. মাহবুবুর রহমান মিলন বলেন, “প্রচণ্ড গরমের কারণে শিশুরা ঘেমে যাচ্ছে। আবার হঠাৎ বৃষ্টির কারণে সেই ঘাম শরীরে বসে ঠান্ডা লেগে যাচ্ছে। এছাড়া সামনেই শীত আসছে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের সময়টাতে এক ধরনের জীবাণু দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। মূলত এসব কারণেই শিশুরা নিউমোনিয়া নিয়ে আসছে, আবার অনেকেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।”
অভিভাবকদের যেসব পরামর্শ দিলেন চিকিৎসক
বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. মো. মাহবুবুর রহমান মিলন। বিশেষ করে নবজাতক ও শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
শুধু মায়ের বুকের দুধ: জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এ সময়ে শিশুকে সুজি, কৌটার দুধ কিংবা বাইরের কোনো খাবার না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তার মতে, ছয় মাসের আগে বাইরের খাবার বা কৌটার দুধ খাওয়ালে শিশু ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার মতো সংক্রমণে সহজেই আক্রান্ত হতে পারে।
সময়মতো টিকাদান: শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সরকারি কর্মসূচির আওতায় দেওয়া ইপিআই (EPI) টিকাগুলো নির্ধারিত সময়ে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন এই চিকিৎসক।
এছাড়া শিশুর সামান্য সর্দি-কাশি হলেও বিষয়টি অবহেলা না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে কিংবা কাশির সঙ্গে জ্বর থাকলে বাড়িতে বসে না থেকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
শিশুদের স্বাস্থ্যের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়ার পাশাপাশি আবহাওয়ার পরিবর্তনের এই সময়ে ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, শিশুদের অস্বস্তিকর গরম ও হঠাৎ ঠান্ডার পরিবেশ থেকে যথাসম্ভব সুরক্ষিত রাখা এবং কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছে।


