ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আরও ১০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে নতুন গঠিত কোনো কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়া হয়নি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। একপর্যায়ে বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্য সংসদ কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান।
বুধবার রাতে জাতীয় সংসদে নতুন ১০টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। এর আগে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হয়।
জাতীয় সংসদে বর্তমানে মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত এবং বাকি ১১টি সংসদ-সংক্রান্ত কমিটি। এখন পর্যন্ত ২৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিরোধী দল সংসদে তাদের আসনসংখ্যার অনুপাতে ১০টিসহ মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিরোধী দলের ভাগে এসেছে কেবল সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতির পদ।
কমিটি গঠনের পর শুরু বিতর্ক
দিনের শেষ কার্যসূচি হিসেবে সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। তিনি পর্যায়ক্রমে ১০টি স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করেন এবং প্রস্তাবগুলো পাস হয়।
তবে নতুন গঠিত ১০টি কমিটির একটিতেও বিরোধী দলের কাউকে সভাপতি করা হয়নি। এরপর পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি দলের আচরণের কারণে বিরোধী দলের সংসদে থাকার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, আসনসংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের প্রায় ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার কথা এবং সদস্য বণ্টনের ক্ষেত্রে সরকারি দল তা মেনে চললেও সভাপতি পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে না।
বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, সংসদীয় কমিটির সভাপতি কোন দল থেকে কতজন হবেন, সে বিষয়ে কার্যপ্রণালি বিধিতে কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই। ফলে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
তিনি অভিযোগ করেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সরকারি দল নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই সব সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি দেওয়ার সঙ্গে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের বিষয়টি যুক্ত করারও সমালোচনা করেন তিনি।
বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, সংসদে শতভাগ কমিটির সভাপতি পদ সরকারি দল নিতে পারে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছাই যদি সংসদের একমাত্র সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ভালো উদাহরণ নয়।
তিনি ভবিষ্যতে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও বিরোধী দলকে বাদ দেওয়া হলে সংসদে তাদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন।
বিরোধী সদস্যদের সংসদ কক্ষ ত্যাগ
বিরোধীদলীয় উপনেতার বক্তব্যের পর বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্যকে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করতে দেখা যায়। তবে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াকআউটের ঘোষণা দেননি। এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহসহ কয়েকজন সদস্য তখনও সংসদ কক্ষে অবস্থান করছিলেন।
এ সময় বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা বক্তব্য দেওয়ার পর তাঁর জবাব না শুনেই বিরোধী সদস্যরা সংসদ কক্ষ ছেড়ে গেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদে বিরোধী দলের আসনসংখ্যার অনুপাতে কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা বর্তমানে নেই। অতীতেও এমন কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা ছিল না।
তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলকে ১০টি কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হবে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা চুক্তি হয়নি।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রসঙ্গ তুলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টনের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক পরিবর্তনের পর সংসদীয় কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হলে বিরোধী দল তাদের আনুপাতিক হারে সভাপতি পদ পাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি না দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিরোধী দল সহযোগিতা করছে না।
জুলাই সনদে কী বলা হয়েছে
বর্তমান সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে বিরোধী দলের সদস্যদের সংসদীয় কমিটির সভাপতি করার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদে বিরোধী দলের জন্য একাধিক কমিটির সভাপতি পদ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
সনদ অনুযায়ী, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের সদস্যদের দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ সংসদে বিরোধী দলের আসনসংখ্যার অনুপাতে বণ্টনের প্রস্তাবও রয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদের এ প্রস্তাবে বিএনপিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট সম্মতি জানিয়েছিল।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দিতে সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য নয়। কারণ, সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে কোন দল থেকে কতজন কমিটির সভাপতি হবেন, সে বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়নি।
যাঁরা নতুন কমিটির সভাপতি হলেন
নতুন গঠিত কমিটিগুলোর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হয়েছেন শিক্ষকনেতা সেলিম ভূঁইয়া। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন সেলিমা রহমান।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হুইপ রকিবুল ইসলামকে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে কলিম উদ্দিন আহমেদকে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হয়েছেন আমানউল্লাহ আমান।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন হুইপ জি কে গউছ। ভূমি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে নাসের রহমানকে এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হয়েছেন রফিকুল ইসলাম জামাল।
এর আগে গত রোববারও সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল।


