লোগো
Advertisement

সিডনির পথে মঞ্চের বাইরের অন্য এক জেমস

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৩ এএম
Advertisement

সিডনির ব্যস্ত রাস্তা। যে যার কাজে ছুটছেন। এরই মধ্যে ফুটপাতের এক পাশে দাঁড়িয়ে বেহালা বাজাচ্ছেন এক তরুণ পথশিল্পী। হঠাৎ সেই সুরে থেমে গেলেন জেমস। কোনো মঞ্চ নেই, নেই দর্শকদের ভিড় কিংবা আলোর ঝলকানি। অচেনা এক শিল্পীর বাদন শুনতে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন বাংলাদেশের নগরবাউল।

মঞ্চে যাঁকে ঘিরে হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস, সেই জেমসকেই সিডনিতে দেখা গেল একেবারেই অন্যরকমভাবে। কনসার্টের পর কয়েকটি দিন শহরটিতে নিজের মতো করে সময় কাটিয়েছেন তিনি। কখনো পথশিল্পীর গান শুনেছেন, কখনো সাধারণ ক্রেতার মতো ঘুরেছেন দোকানে, আবার কখনো ক্যামেরা হাতে ঘুরে বেড়িয়েছেন সিডনির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে।

১২ সেপ্টেম্বর রাতে সিডনির নরওয়েস্টের হিলসং কনভেনশন সেন্টারে গিটার হাতে মঞ্চে উঠেছিলেন জেমস। সঙ্গে ছিলেন কলকাতার ফসিলস ব্যান্ডের রূপম ইসলাম। ‘দুষ্টু ছেলের দল’, ‘তারায় তারায়’, ‘ভিগি ভিগি’সহ একের পর এক জনপ্রিয় গানে মাতেন দর্শকেরা। আবেগঘন ‘মা’ গানেও তৈরি হয় অন্যরকম পরিবেশ।

কনসার্টের সেই উচ্ছ্বাসের পরের চার দিন যেন জেমসের সম্পূর্ণ আলাদা এক অধ্যায়।

চারপাশে শহরের চেনা ব্যস্ততা, অথচ জেমস স্থির

পথশিল্পীর বেহালায় মুগ্ধতা

কনসার্ট শেষ হওয়ার পর আরও চার দিন সিডনিতে ছিলেন জেমস। এই সময়টায় তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন সফরসঙ্গীরা। স্বভাবতই কম কথা বলা এই শিল্পী জনসমক্ষে নিজের মতো থাকতেই পছন্দ করেন।

সিডনির এক ব্যস্ত সড়কে পথশিল্পীর বেহালা বাজানো শুনতে থেমে যাওয়ার ঘটনাটি ছিল তেমনই একটি মুহূর্ত। তরুণ শিল্পীকে ঘিরে বড় কোনো আয়োজন ছিল না। জেমসও নিজের পরিচয় জানানোর চেষ্টা করেননি। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে শুনেছেন বাদন।

সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ভাষ্য, পুরো সময়টায় তাঁর মনোযোগ ছিল সুরের দিকে। যেন একজন সংগীতশিল্পী আরেকজন শিল্পীর সৃষ্টি উপভোগ করছিলেন—পরিচয় কিংবা খ্যাতি সেখানে কোনো বিষয়ই ছিল না।

কখনো তাঁর সহযাত্রী হয়েছেন দীর্ঘদিনের সঙ্গী আহসান এলাহী ফান্টি

দোকানে আর দশজন ক্রেতার মতো

সিডনির বিভিন্ন বিপণিবিতান ও বাজারেও ঘুরেছেন জেমস। তারকাসুলভ কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করেছেন। সহধর্মিণীর দেওয়া তালিকা অনুযায়ী বিভিন্ন জিনিস কিনেছেন।

নিজের পছন্দের সুগন্ধি কিনতে শহরের একটি পুরোনো অভিজাত দোকানেও যান তিনি। সেখানে বেশ কিছু সময় নিয়ে বিভিন্ন সুগন্ধি পরীক্ষা করেন। এরপর পছন্দেরটি কিনে বেরিয়ে আসেন।

দোকানের অন্য ক্রেতাদের মতোই ছিলেন তিনি। বাড়তি কোনো আয়োজন কিংবা বিশেষ মনোযোগ ছিল না তাঁকে ঘিরে।

ক্যামেরায় সিডনির অন্য ছবি

সংগীতের পাশাপাশি আলোকচিত্রের প্রতিও জেমসের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। সিডনি সফরেও ক্যামেরা ছিল তাঁর সঙ্গে।

বিকেলের দিকে কখনো আয়োজক বেঙ্গলি সিনে ক্লাবের তানিম মান্নান, প্রসেনজিৎ রায় ও সৈকত মণ্ডলের সঙ্গে বের হয়েছেন। আবার কখনো সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন আহসান এলাহী ফান্টি, গিটারিস্ট তালুকদার সাব্বির, ইশমামুল ফরহাদ, কিবোর্ডিস্ট আবদুল কাইয়ুম ও ব্যবস্থাপক রুবাইয়াত ঠাকুর।

কখনো গন্তব্য ছিল হারবারের তীরে কিরিবিলি, কখনো সিডনি অপেরা হাউস। গোধূলির আলো, হারবার ব্রিজ, পানির ঢেউ কিংবা অপেরা হাউসের স্থাপত্য—সবকিছুই নিজের ক্যামেরায় ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।

কিরিবিলিতে ছবি তুলতে গিয়ে মজার একটি ঘটনাও ঘটে। জেমস ও তাঁর সঙ্গীরা তাঁদের একটি ছবি তুলে দেওয়ার জন্য এক পথচারীর সাহায্য চান। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তি নিজেও পেশাদার আলোকচিত্রী। ক্যামেরা হাতে নিয়ে তিনি জেমসকে বিভিন্নভাবে পোজ দেওয়ার নির্দেশ দিতে থাকেন।

অচেনা একজনের নির্দেশও হাসিমুখে মেনে নেন জেমস। বিরক্তির কোনো প্রকাশ ছিল না তাঁর মধ্যে। বরং পুরো ঘটনাটি উপভোগ করেছেন বলে জানান সফরসঙ্গীরা।

সঙ্গে ছিল না বাড়তি নিরাপত্তা কিংবা তারকাসুলভ আড়ম্বর

ফরাসি জ্যাজে, আড্ডায় ‘আমার বাংলা’

সিডনির পথে গাড়িতে ঘোরার সময় জেমসের পছন্দের তালিকায় ছিল ফরাসি জ্যাজ। ভাষাটি না বুঝলেও সংগীতের আবেগ তাঁকে টেনেছে।

আড্ডায় উঠে আসে সংগীত, ঢাকার রিকশায় ঘোরার অভিজ্ঞতা এবং তাঁর জনপ্রিয় কয়েকটি গান তৈরির গল্প। তবে নিজের কথা বলার চেয়ে অন্যদের কথা শুনতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন তিনি। মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন, মাঝেমধ্যে প্রশ্ন করেছেন; আবার কখনো জানালার বাইরে তাকিয়ে থেকেছেন নীরবে।

সিডনির কনসার্টে দুই বাংলার শিল্পী ও দর্শকদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও জেমসকে স্পর্শ করেছে। আয়োজকদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এই আয়োজনের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—এখানে পুরো বাংলাকে এক সুতোয় যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ, কলকাতা, সিডনি কিংবা আমেরিকা—বাঙালি যেখানেই থাকুক, তাদের আত্মিক টান ‘আমার বাংলা’।

সিডনিতেও ক্যামেরা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী

বিদায়ের আগে নির্ভার জেমস

সিডনিতে চার দিনের অবস্থান শেষে ১৬ সেপ্টেম্বর মেলবোর্নের উদ্দেশে রওনা হন জেমস। বিদায়ের আগে সিডনির দিনগুলো নিয়ে সন্তুষ্টির কথাই জানিয়েছেন তিনি।

কয়েক দিন আগেও যে শিল্পীকে ঘিরে কনসার্টে ছিল হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাস, সেই মানুষটিকেই সফরের শেষ দিকে দেখা গেল একান্ত নিজের জগতে। কখনো অচেনা পথশিল্পীর সুরে থেমে যাওয়া, কখনো ক্যামেরা হাতে শহর দেখা, আবার কখনো নিঃশব্দে চারপাশ পর্যবেক্ষণ—সিডনিতে জেমসের এই সময়গুলো ছিল মঞ্চের আলো থেকে অনেক দূরের।

১৯ সেপ্টেম্বর মেলবোর্নে তাঁর পরবর্তী কনসার্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর দেশে ফেরার কথা রয়েছে নগরবাউলের।

আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...