চুয়াডাঙ্গা শহর ছোট। কিন্তু শহরের রাস্তায় এখন যানবাহনের চাপ যেন বড় শহরের মতো। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশার সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, তাতে শহরের স্বাভাবিক চলাচল অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে মানুষের যাতায়াতের সহজ মাধ্যম হিসেবে ইজিবাইকের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল ও যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামার কারণে তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
প্রশ্ন হলো ইজিবাইক কি সমস্যা, নাকি ইজিবাইকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনাই আসল সমস্যা?
আমাদের দৃষ্টিতে, সমস্যাটি ইজিবাইক থাকা নয়; সমস্যাটি হচ্ছে নিয়ম না মেনে ইজিবাইক পরিচালনা, নির্দিষ্ট স্টপেজের অভাব, রাস্তার ওপর যত্রতত্র অবস্থান এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।

যাত্রী দেখলেই ব্রেক – পেছনে কী আছে, তা কি চালকের দেখার সময় আছে?
চুয়াডাঙ্গা শহরের ব্যস্ত সড়কগুলোতে ইজিবাইকের একটি সাধারণ দৃশ্য এখন অনেকের কাছেই পরিচিত। চালক সামনে একজন সম্ভাব্য যাত্রী দেখলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক করে দাঁড়িয়ে গেলেন।
পেছনে মোটরসাইকেল আছে কি না, প্রাইভেটকার আসছে কি না, বাস বা ট্রাক আসছে কি না এসব বিবেচনা করার সময় যেন নেই।
ফলে পেছনের যানবাহনকে হঠাৎ ব্রেক করতে হয়। কখনো পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে তৈরি হয় বিপজ্জনক পরিস্থিতি। কখনো সামান্য অসতর্কতাই পরিণত হতে পারে বড় দুর্ঘটনায়।
বিশেষ করে শহরের ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ থেমে যাওয়া কোনো সাধারণ বিষয় নয়; এটি সরাসরি সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

রাস্তার মাঝখানেই যাত্রী ওঠানামা!
চুয়াডাঙ্গা শহরের যানজটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা।
রাস্তার পাশে পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় ইজিবাইক রাস্তার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে। একটি ইজিবাইক দাঁড়ানোর পর তার পেছনে আরেকটি, এরপর আরেকটি কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি লেন কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এভাবে চলতে থাকলে রাস্তা যত প্রশস্তই হোক, যানজট কমবে না।
কারণ যানজট শুধু গাড়ির সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে হয় না। রাস্তার জায়গা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও যানজটের বড় কারণ।

বড়বাজার: পুরাতন ব্রিজের মুখে নিত্যদিনের ভোগান্তি
চুয়াডাঙ্গা বড়বাজারের পুরাতন ব্রিজের মুখ, বিশেষ করে মসজিদের সামনের অংশে ইজিবাইক ও অটোরিকশার অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে আছে।
ব্রিজের মুখ এমনিতেই গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট। এখান দিয়ে যানবাহনকে ব্রিজে উঠতে হয়। অথচ সেই জায়গাতেই যখন একাধিক ইজিবাইক ও অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকে, তখন চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে।
একদিকে ব্রিজে ওঠার জন্য যানবাহন, অন্যদিকে বাজারমুখী মানুষ, তার সঙ্গে ইজিবাইকের সারি সব মিলিয়ে তৈরি হয় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।
একটি গাড়ি সামান্য ভুল করলেই অন্য গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়।
ব্রিজের মুখ কোনো স্ট্যান্ড হতে পারে না।

নতুন বাজারেও একই চিত্র
নতুন বাজার এলাকায়ও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। যেখানে যাত্রী পাওয়া যায়, সেখানেই থামছে ইজিবাইক। নির্দিষ্ট স্টপেজের পরিবর্তে রাস্তার সুবিধামতো জায়গাকে স্টপেজ বানিয়ে ফেলার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
ফলে পথচারী, মোটরসাইকেল, রিকশা, প্রাইভেটকার সবাইকে একই জায়গা দিয়ে চলতে হচ্ছে।
এভাবে একটি শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা কখনোই স্বাভাবিক থাকতে পারে না।

হাসপাতাল রোডে শৃঙ্খলার প্রয়োজন আরও বেশি
চুয়াডাঙ্গা হাসপাতাল রোডের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শুধু একটি সাধারণ সড়ক নয় এটি হাসপাতালমুখী মানুষের অন্যতম প্রধান চলাচলের পথ।
এখানে রোগী আসে, অ্যাম্বুলেন্স আসে, জরুরি রোগী নিয়ে স্বজনরা ছুটে আসেন। এমন একটি জায়গায় সামান্য যানজটও কখনো কখনো গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
এই জায়গায় ইজিবাইক বা অন্যান্য যানবাহন এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে সমস্যাটি শুধু যানজটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জরুরি স্বাস্থ্যসেবার পথেও বাধা তৈরি করতে পারে।
এখানেই পুলিশের উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে
চুয়াডাঙ্গার মাননীয় পুলিশ সুপারকে এ বিষয়ে ধন্যবাদ জানাতেই হয়।
হাসপাতাল রোডে পুলিশের সদস্যদের দায়িত্বে রাখা, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যানজট নিয়ন্ত্রণে কাজ করা এবং হাসপাতাল এলাকায় ইজিবাইককে অনিয়ন্ত্রিতভাবে দাঁড়াতে না দেওয়া এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
বিশেষ করে একমুখী চলাচলের ব্যবস্থা করার ফলে ওই এলাকায় যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা দৃশ্যমান হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট মনে করে, ভালো উদ্যোগ শুধু প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয় – এগুলোকে আরও শক্তিশালী ও স্থায়ী করার জন্য জনসাধারণের সহযোগিতাও প্রয়োজন।

শুধু ইজিবাইক নয়, দায় আছে বড় যানবাহনেরও
তবে চুয়াডাঙ্গা শহরের যানজটের সব দায় ইজিবাইকের ওপর চাপিয়ে দিলে বাস্তব চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
কারণ ইদানীং বড় পরিবহন ও দূরপাল্লার বাসকেও শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
বিশেষ করে সন্ধ্যার পর কিংবা দিনের বিভিন্ন সময়ে ব্রিজের মুখে বড় বাস দাঁড়িয়ে থাকার ঘটনা পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ব্রিজের মুখে একটি বড় বাস দাঁড়িয়ে থাকলে পেছন থেকে আসা যানবাহনের চালকের দৃষ্টিসীমা কমে যায়। একই সঙ্গে ব্রিজে ওঠার সময় যানবাহনকে পাশ কাটিয়ে যেতে হয়।
এতে শুধু যানজট নয়, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
যদি ছোট যানবাহনকে নিয়ম মানতে বলা হয়, তাহলে বড় যানবাহনের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
তাহলে সমাধান কী?
শুধু ইজিবাইক বন্ধ করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ শহরের বিপুলসংখ্যক মানুষ ইজিবাইকের ওপর নির্ভরশীল। বহু চালকের পরিবারের জীবিকা এই যানবাহনের আয়ের সঙ্গে যুক্ত।
তাই প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা।
চুয়াডাঙ্গা শহরকে যানজটমুক্ত করতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে –
১. নির্দিষ্ট ইজিবাইক স্ট্যান্ড ও যাত্রী ওঠানামার স্থান নির্ধারণ করতে হবে।
২. গুরুত্বপূর্ণ মোড়, ব্রিজের মুখ ও হাসপাতালের প্রবেশপথে ইজিবাইক দাঁড়ানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।
৩. রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো বন্ধ করতে হবে।
৪. যাত্রী দেখলেই হঠাৎ ব্রেক করার প্রবণতা বন্ধ করতে চালকদের সচেতন করতে হবে।
৫. ইজিবাইক চালকদের জন্য ট্রাফিক আইন ও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৬. শহরের প্রধান সড়কগুলোতে নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে।
৭. হাসপাতাল রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ব্যস্ত এলাকাতেও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
৮. বড় বাস ও দূরপাল্লার পরিবহনের জন্যও নির্দিষ্ট পার্কিং বা অপেক্ষমাণ স্থান নির্ধারণ করতে হবে।
৯. ব্রিজের মুখ, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাজার এলাকার রাস্তা দখল করে কোনো যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকলে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে।
১০. শুধু অভিযান নয় – দীর্ঘমেয়াদি ট্রাফিক পরিকল্পনা করতে হবে।
প্রশ্নটা ইজিবাইক থাকবে কি থাকবে না – তা নয়
আমাদের মনে রাখতে হবে, ইজিবাইক চুয়াডাঙ্গার মানুষের প্রয়োজনের অংশ হয়ে গেছে। স্বল্প খরচে শহরের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য এটি সাধারণ মানুষের গুরুত্বপূর্ণ বাহন।
কিন্তু কোনো বাহন মানুষের প্রয়োজনীয় হলেই সেটি যেখানে-সেখানে দাঁড়ানোর অধিকার পেতে পারে না।
একজন ইজিবাইক চালকের যেমন জীবিকা নির্বাহের অধিকার আছে, তেমনি একজন পথচারীর নিরাপদে হাঁটার অধিকার আছে। একজন রোগীর দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর অধিকার আছে। একজন মোটরসাইকেল চালকের নিরাপদে চলার অধিকার আছে। একজন বাসযাত্রীরও নিরাপদ যাত্রার অধিকার আছে।
শহরের রাস্তা কারও একার নয়।
চুয়াডাঙ্গা শহরকে আমরা কেমন দেখতে চাই?
আমরা এমন একটি চুয়াডাঙ্গা চাই যেখানে ইজিবাইক থাকবে, কিন্তু বিশৃঙ্খলা থাকবে না।
অটোরিকশা থাকবে, কিন্তু রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকবে না।
বাস চলবে, কিন্তু ব্রিজের মুখ আটকে দাঁড়িয়ে থাকবে না।
বাজার থাকবে, কিন্তু বাজারের কারণে পুরো সড়ক অচল হবে না।
হাসপাতাল থাকবে, কিন্তু রোগী নিয়ে আসা গাড়িকে যানজটে আটকে থাকতে হবে না।
আর ট্রাফিক পুলিশ থাকবে শুধু যানজট হলে নয়—যানজট হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করার পরিকল্পনা নিয়ে।
শেষ কথা
চুয়াডাঙ্গা শহরের বর্তমান যানজটকে শুধু ‘ইজিবাইকের সমস্যা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি একটি সামগ্রিক নগর ব্যবস্থাপনার বিষয়।
ইজিবাইকের সংখ্যা বেড়েছে—এটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, স্ট্যান্ড, পার্কিং, যাত্রী ওঠানামার স্থান এবং আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা কতটা আধুনিক হয়েছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট মনে করে, সময় এসেছে সমস্যাকে দায় চাপানোর দৃষ্টিতে নয়, সমাধানের দৃষ্টিতে দেখার।
ইজিবাইক চালককে শত্রু বানিয়ে নয়, তাদের নিয়মের মধ্যে এনে; সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে রেখে নয়, তাদের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করে; আর আইনকে কাগজে রেখে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করে—চুয়াডাঙ্গা শহরকে আরও সুন্দর, নিরাপদ ও যানজটমুক্ত করা সম্ভব।
কারণ—
এই শহর শুধু চালকদের নয়, শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, শুধু পথচারীদের নয়—এই শহর আমাদের সবার।
আর আমাদের সবার শহরের রাস্তা সবার চলাচলের জন্যই উন্মুক্ত ও নিরাপদ থাকা উচিত।


