রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগ চেয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ১১টায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের একটি সম্মেলন কক্ষে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বড় ধরনের ঢল নেমেছে। ২০১৭ সালের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বর্তমানে বাংলাদেশ ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে।
তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী শিবিরে বসবাসের কারণে রোহিঙ্গাদের একটি নতুন প্রজন্ম অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে। প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
মানবিক সহায়তায় চাপ বাড়ছে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিশুদের জন্য প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।
তবে দীর্ঘস্থায়ীভাবে শিবিরে বসবাস কোনো স্থায়ী সমাধান নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীও সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপের মুখে পড়েছে।
তারেক রহমান জানান, মানবিক সহায়তার প্রয়োজন বাড়লেও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় যেখানে ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হয়েছিল, ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে।
তার ভাষায়, শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্যোগও প্রয়োজন।
প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই করতে হবে। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ ও জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
সম্প্রতি জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহের সঙ্গেও বৈঠকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান।
পাঁচ দফা পদক্ষেপের প্রস্তাব
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
এর মধ্যে রয়েছে—রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি; মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ; পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা; গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং মানবপাচার, মাদকপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা ও অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো।
প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার ভূমিকার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থাকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
‘রোহিঙ্গাদের চিরকাল বাস্তুচ্যুত রাখা যাবে না’
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। তাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদে, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হলে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে এই দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘদিন চাপিয়ে রাখা সম্ভব নয়; আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
জাতিসংঘের এই বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজন করায় গাম্বিয়াকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি সহ-আয়োজক হিসেবে সংহতি প্রকাশ করা অংশীদারদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির ধারাবাহিকতায় আটকে না থাকে—বরং ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়ে সংকটের অবসান ঘটাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।


