বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন: যোগ্য কাজ নেই ৬০% স্নাতকের

কর্মসংস্থানের এই অনানুষ্ঠানিকতা শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসা বা ছোট প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানেও মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে অনানুষ্ঠানিক খাতের ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, বিকল্প বা নিয়মিত চাকরি না পেয়ে তাঁরা ব্যবসা বা নিজস্ব উদ্যোগ শুরু করেছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের অনানুষ্ঠানিক খাত জরিপ বিশ্লেষণ করেছে বিশ্বব্যাংক।
আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কর্মসংস্থান তৈরির গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম। বাংলাদেশে এসব প্রতিষ্ঠানে বছরে কর্মসংস্থান বাড়ছে ২ দশমিক ৭% হারে।
যেখানে বিশ্বের ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
কর্মসংস্থানের এই দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কম উৎপাদনশীলতা। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রমিকপ্রতি উৎপাদন বৃদ্ধির হার বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় কম। পর্যটন ও খাদ্যসংশ্লিষ্ট খাতেও কর্মসংস্থান বাড়ছে ধীরগতিতে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর একাংশ নতুন কর্মী নেওয়ার বদলে কর্মীর সংখ্যা কমাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশে ২০৫১ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা বেড়ে মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তখন বাংলাদেশ বয়স্ক সমাজে পরিণত হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় হাতে সময় অনেকটা বেশি (১৯ বছর) থাকলেও এই সুযোগ কাজে লাগাতে কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ভারতের হাতে এই সুযোগ কাজে লাগানোর সময় মাত্র আট বছর, আর ভুটানের পাঁচ বছর।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্বাস্থ্য খাতেও শহর ও গ্রামের বৈষম্য প্রকট। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ সেখানে কর্মরত। শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি। অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সব উপাদান রয়েছে দেশের মাত্র ১৮ শতাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম পাওয়া যায় মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ কেন্দ্রে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশে ইনজেকশনে দেওয়ার ইনসুলিন এবং ৩৮ শতাংশে মেটফরমিন পাওয়া যায়। হৃদ্রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান রয়েছে ১ শতাংশের কম প্রতিষ্ঠানে।
দেশের শিক্ষার ভিত্তিও শক্তিশালী নয়। প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ৩৬ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ায় যার গড় ৬২ শতাংশ। সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ও এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা মোট সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের মাত্র ২ শতাংশ পায়। প্রবীণদের সরকারি বয়স্ক ভাতা মাসে ৫০০ টাকা, যা দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের গড় আয়ের মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির কারণে এই ভাতার প্রকৃত মূল্য আরও কমেছে।
২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য উল্লেখযোগ্য পেনশন কর্মসূচি নেই। অথচ দেশের অধিকাংশ মানুষ এই খাতেই কাজ করেন। কম কর-রাজস্ব আদায়ের কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় বাড়ানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অর্থায়ন সহজ করা এবং শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

