শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট
শিরোনাম
বিজ্ঞাপন

আঞ্চলিক সংগঠনের দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত সাজেক, পর্যটন ব্যবসায় ধস

নিজস্ব প্রতিবেদক০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৭ এএম
আঞ্চলিক সংগঠনের দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত সাজেক, পর্যটন ব্যবসায় ধস

খাগড়াছড়ি-সাজেক রুটের আরেক জিপচালক মো. মুন্না বলেন, পর্যটক কমে যাওয়ায় গাড়ি চালিয়ে আগের মতো আয় হচ্ছে না। অনেক দিন ধরে গাড়ি চালাতে পারছেন না তারা। তাদের মতো শ্রমজীবী মানুষের আয় বন্ধ হলে পরিবার নিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, সাজেকে আমরা যারা গাড়ি চালাই, প্রত্যেকে গাড়িপ্রতি বিভিন্ন সংগঠনকে চাঁদা দিয়ে টোকেন নিয়ে গাড়ি চালাই। এরপরও আমাদের এত কষ্ট পেতে হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি সিএনজি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জসীম বলেন, সাজেকে অবরোধের কারণে খাগড়াছড়ির পরিবহন খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। সাজেককেন্দ্রিক প্রায় সাড়ে তিন হাজার জিপ ও সিএনজি চলাচল বন্ধ থাকায় চালক-সহকারীরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। গাড়ির মালিকেরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দ্রুত পরিস্থিতির সমাধান না হলে পরিবহন খাতের ক্ষতি আরও বাড়বে। তার অভিযোগ, আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারের বিরোধের কারণে টানা অবরোধে সাজেকসহ খাগড়াছড়ির পর্যটনকেন্দ্রগুলো অচল হয়ে পড়েছে।

সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা (জন) বলেন, মেঘের রাজ্য সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেকে আসেন। কিন্তু এবার টানা অবরোধের কারণে সাজেকসহ খাগড়াছড়ির পর্যটনকেন্দ্রগুলো পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। এর মাশুল গুনতে হচ্ছে তাদের।

রাহুল চাকমা বলেন, পর্যটন মৌসুমে খাগড়াছড়ি ও সাজেকে প্রতিদিন অন্তত দেড় থেকে দুই কোটি টাকার লেনদেন হতো। এর সুফল পেতেন পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত সবাই। কিন্তু টানা অবরোধে পুরো পর্যটনশিল্প স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক বুকিং বাতিল করতে হয়েছে। বিনিয়োগ করা বিপুল পরিমাণ অর্থ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কর্মচারীদের বেতন দিতে না পেরে অনেককে বাধ্য হয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন তারা। কবে নাগাদ অবরোধ শিথিল হবে, তারও কোনো ইঙ্গিত পাচ্ছেন না। সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির মূল দাবি জেএসএসের (সন্তু গ্রুপ) সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া কবে পূরণ হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে সাজেকে টানা অবরোধের কারণে পাহাড়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরাও। সাজেক ও আশপাশের এলাকায় উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ফলমূল ও শাকসবজি পরিবহন করতে না পারায় ক্ষেত ও স্থানীয় বাজারে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। এতে একদিকে কৃষকেরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সাজেকে খাদ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিবছর পর্যটন মৌসুম এলেই পাহাড়ের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের তৎপরতা বেড়ে যায়। চাঁদা আদায় ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। পাহাড়ে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পাহাড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ও দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা খাগড়াছড়ি ও সাজেক ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অনেকে খাগড়াছড়ি ও সাজেকের পরিবর্তে রাঙামাটির লেককেন্দ্রিক পর্যটন এলাকা কিংবা বান্দরবানের দিকে যাচ্ছেন। এতে খাগড়াছড়ির পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন খাত সচল রাখতে অবরোধের স্থায়ী সমাধান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবহনশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় পাহাড়ের পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হতে পারে।

খাগড়াছড়ি হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মীর হোসেন বলেন, পর্যটন মৌসুমে খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের আগমনে হোটেল-রিসোর্টগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য থাকে। কিন্তু বর্তমানে পর্যটক না থাকায় অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টে বুকিং কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে হোটেলকর্মীদের ওপরও। পর্যটন খাত সচল রাখতে দ্রুত অবরোধ প্রত্যাহার ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

সারাদেশ থেকে আরও পড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...