লোগো
Advertisement

অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৩ এএম
Advertisement

দেশজুড়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ তিন চাকার বৈদ্যুতিক যানবাহনের সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ লাখের মধ্যে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এসব যান চার্জ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

সোমবার সংসদে কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধিতে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর আনা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

‘নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা চলাচল প্রসঙ্গে’ শিরোনামে দেওয়া নোটিশে রেহানা আক্তার রানু বলেন, রাজধানীর সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ট্রাফিক ক্যামেরা স্থাপনের পর ট্রাফিক আইন ভাঙার কিছু প্রবণতা কমেছে। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে এখনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।

তার ভাষ্য, এসব যানবাহনে নম্বর প্লেট না থাকায় এআই ক্যামেরায় কোনো অনিয়ম শনাক্ত হলেও সংশ্লিষ্ট যানকে জরিমানা করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়ছে চাপ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান শহর ও গ্রামের পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কম ভাড়া, সহজলভ্যতা এবং স্বল্প দূরত্বে দ্রুত যাতায়াতের সুবিধার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এসব যান জনপ্রিয় হয়েছে।

তবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। বিপুলসংখ্যক যান একই সময়ে চার্জে দেওয়ার ফলে স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত লোড তৈরি হচ্ছে। কোথাও আবাসিক সংযোগ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার কোথাও ট্রান্সফরমার ও বিতরণ লাইনের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।

সরকারি হিসাবে, দেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি। বিপরীতে শুধু ঢাকাতেই ৪৮ হাজারের বেশি অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এসব অবৈধ চার্জিং পয়েন্টে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে একদিকে জাতীয় ও স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সড়ক নিরাপত্তাতেও উদ্বেগ

অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল শুধু যানজট নয়, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে বলে সংসদে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অংশ ছিল ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

অনিবন্ধিত যানবাহন, অপ্রশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, ব্রেক ও আলো ব্যবস্থার সমস্যা, অতিরিক্ত গতি এবং মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া নির্দিষ্ট রুট, স্ট্যান্ড ও পার্কিং ব্যবস্থা না থাকা এবং যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনায়ও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

পরিবেশ নিয়েও শঙ্কা

ব্যাটারিচালিত যানবাহনে ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত পুনর্ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার ও রিসাইক্লিংয়ের ফলে সিসাদূষণ, মাটি ও পানিদূষণের ঝুঁকি বাড়ছে। এতে শিশু শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও পোল্ট্রি শিল্পও ক্ষতির মুখে পড়ছে।

ঢাকায় বাড়ছে এআই ক্যামেরা

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজধানীতে এআইভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে বলেও সংসদে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বর্তমানে ঢাকার ১৭টি সিগন্যালে ৫০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা চালু রয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে।

এরই ধারাবাহিকতায় রমনা ও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে আরও ২০০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতেও এ ধরনের ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।

নম্বর প্লেট ও কিউআর কোডে আসবে অটোরিকশা

অটোরিকশা খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার নীতিমালা তৈরির কাজ করছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে অনুমোদিত অটোরিকশাগুলো নম্বর প্লেট ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে। চালকদের নিবন্ধনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্সের আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ ছাড়া কোন সড়কে অটোরিকশা চলবে, কতসংখ্যক যান চলাচল করবে, কোথায় স্ট্যান্ড ও পার্কিং থাকবে—এসব বিষয়ও নির্ধারণ করা হবে। একটি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক অটোরিকশা চালানো ঠেকাতেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে যানবাহন ও ব্যাটারি ট্র্যাক করার ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী।

কর্মসংস্থান বিবেচনায় নিয়ন্ত্রণের দাবি

সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, তিনি অটোরিকশা বন্ধের দাবি করছেন না; বরং এসব যানকে নিয়মের মধ্যে আনার কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, অটোরিকশার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে এসব যান জব্দ করা, ডাম্পিং করা কিংবা চালকদের হয়রানি করা উচিত নয়। প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের সুযোগ দেওয়ারও প্রস্তাব দেন তিনি।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। নীতিমালা ও বিধি প্রণয়নের কাজ এগিয়েছে। কর্মসংস্থান যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরে—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে।

সরকারের লক্ষ্য অটোরিকশার সঙ্গে জড়িত মানুষের কর্মসংস্থান নষ্ট না করে একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও সড়ক নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা।

আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...