চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে অ্যাপেন্ডিসাইটের অপারেশনের পর সোহাগী খাতুন (১৪) নামে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের অভিযোগ, অপারেশনের পর অবস্থার অবনতি হলেও যথাযথ চিকিৎসা না দিয়ে একপর্যায়ে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়। এরপর আর জ্ঞান ফেরেনি সোহাগীর।
নিহত সোহাগী জীবননগরের বিসিকেএমপি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৭ আগস্ট পেটে ব্যথা নিয়ে সোহাগীকে জীবননগরের মনোয়ারা সনো সেন্টার অ্যান্ড নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম সোহাগীর অ্যাপেন্ডিসাইট হয়েছে বলে জানান এবং দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। পরদিনই তার অপারেশন করা হয়।
পরিবারের দাবি, অপারেশনের পর থেকেই সোহাগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। প্রচণ্ড বমি, মাথাব্যথা ও জ্বর দেখা দিলে ৩০ আগস্ট তাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ২ সেপ্টেম্বর তাকে আবার ওই ক্লিনিকে নিয়ে আসেন স্বজনরা।
সোহাগীর মা লাভলী খাতুনের অভিযোগ, ওই সময় চিকিৎসকের আচরণও ছিল অসহযোগিতাপূর্ণ।
তিনি বলেন, “ডা. রফিকুল ইসলাম আমার মেয়ের অপারেশন করার পর থেকেই ওর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। পরে আবার ক্লিনিকে নিয়ে গেলে প্রথমে আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং চিকিৎসা দিতে চাননি। পরে নিজেই ডেকে নিয়ে ওষুধ ও ঘুমের ইনজেকশন দেন। ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই আমার মেয়ের আর জ্ঞান ফেরেনি।”
পরিবারের সদস্যরা জানান, এরপর সোহাগীর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে দ্রুত তাকে যশোরের কুইন্স হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। তবে আইসিইউতে নেওয়ার প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।
সোহাগীর স্বজনদের দাবি, ঢাকায় নেওয়ার পর চিকিৎসকদের কাছে আগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখানো হলে তারা জানান, ওই সময় সোহাগীর শরীরে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, ভুলভাবে রোগ নির্ণয় করে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করা হয়ে থাকলে সেটিই পরবর্তীতে তার মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকতে পারে।
তবে এ বিষয়ে ঢাকার চিকিৎসকদের লিখিত মতামত বা কোনো মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অস্ত্রোপচারটি চিকিৎসাগতভাবে প্রয়োজনীয় ছিল কি না এবং সোহাগীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সোহাগীর খালা নাসিমা খাতুন বলেন, “ক্লিনিকের ডাক্তার, নার্স ও স্টাফদের আচরণ আমাদের কাছে অত্যন্ত খারাপ লেগেছে। রোগীর সঙ্গে আমাদের সামনেই খারাপ ব্যবহার ও গালিগালাজ করা হয়েছে। আমরা চাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, ডা. রফিকুল ইসলাম নিয়মিত জীবননগরে থাকেন না। তারা দাবি করেন, তিনি সাধারণত ঢাকায় অবস্থান করেন এবং সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার জীবননগরে এসে চেম্বার ও অস্ত্রোপচার করেন। তবে চিকিৎসকের কর্মস্থল, দায়িত্ব পালনের সময়সূচি এবং সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের অনুমোদনসহ বিষয়গুলো সরকারি নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনার পর ডা. রফিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য এ প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একটি কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা, ভুল রোগ নির্ণয় কিংবা অনিয়ম হয়েছিল কি না এখন সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পরিবারের অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন, তেমনি অভিযুক্ত চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
সোহাগীর পরিবারের দাবি, তারা প্রতিশোধ নয়, ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে চান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা চান। একই সঙ্গে জীবননগরের বেসরকারি ক্লিনিক ও চিকিৎসাসেবার মান নিয়েও কার্যকর নজরদারি দাবি করেছেন তারা।


