খসড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন: অনলাইন বাজারে দায়ের কাঠামো নেই

প্রয়োগ-সক্ষমতার প্রশ্নটিও এড়ানো যায় না। নিবন্ধন, যাচাই ও নজরদারির এই বিশাল দায়িত্ব সামলানোর জন্য অধিদপ্তরের জনবল, ডিজিটাল অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কতটা প্রস্তুত, তা কোনো প্রভাব-বিশ্লেষণে দেখানো হয়নি। সামর্থ্যের চেয়ে বড় ক্ষমতা আইনে লিখলে বাস্তবে নির্বাচিতভাবে প্রয়োগ হয়, আর তাতে হয়রানি ও অনিয়মের পথ খোলে। অনেক দেশেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা অভিযোগ-তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ বিক্রেতা চিহ্নিত করে; এ ধরনের তথ্যভিত্তিক তদারকি ছাড়া নিবন্ধন-নীতি কাগুজে থেকে যাবে।
দায় কার? প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি
খসড়ার সবচেয়ে বড় ফাঁক এখানেই। ৩৭ক ধারায় পণ্যের কারিগরি বিবরণ, আকার ও পরিমাপ না দেখালে ‘প্রতিষ্ঠান, প্ল্যাটফর্মের স্বত্বাধিকারী বা বিক্রেতা’র সবাইকে ফৌজদারি দণ্ডের আওতায় রাখা হয়েছে। কিন্তু প্ল্যাটফর্ম কখন, কতটুকু এবং কোন শর্তে দায়ী, তার কোনো স্পষ্ট নীতি নেই। অভিযোগ পেলে কত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে, বিক্রেতার বিজ্ঞাপন নামাতে হবে কি না, অভিযোগ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকবেন কি না—এসবের উল্লেখ নতুন সংযোজিত ধারাগুলোতে পাওয়া যায় না।
ফৌজদারি দণ্ড এখানে ভুল হাতিয়ার হতে পারে। পণ্যের বিবরণ অসম্পূর্ণ থাকা সাধারণত ভুল বা অবহেলার ব্যাপার; এর জন্য প্রথমে সতর্কীকরণ ও সংশোধনের নির্দেশ, তারপর প্রশাসনিক জরিমানাই আনুপাতিক। ভোক্তা যে ক্ষতিপূরণ ও ফেরত চান, কারাদণ্ড তাকে তা দেয় না।
চীনের ই-কমার্স আইনের ৩৮ অনুচ্ছেদ বলে, প্ল্যাটফর্ম যদি জানে বা জানার কথা যে বিক্রেতা ভোক্তার ক্ষতি করছে অথচ ব্যবস্থা নেয়নি, তবে সে বিক্রেতার সঙ্গে যৌথভাবে দায়ী; স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা-সংবেদনশীল পণ্যে যাচাইয়ে ব্যর্থ হলেও দায় আসে। ভারতের ভোক্তা সুরক্ষা (ই-কমার্স) বিধিমালা, ২০২০ প্ল্যাটফর্মকে অভিযোগ-নিষ্পত্তি কর্মকর্তা নিয়োগ, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রাপ্তিস্বীকার এবং এক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিদেশি প্ল্যাটফর্মকে ইউনিয়নের ভেতরে আইনি প্রতিনিধি রাখতে বলে। বাংলাদেশে সীমান্তের ওপার থেকে সরাসরি পণ্য পাঠানো প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ছে; খসড়া এ প্রশ্নে নীরব। শর্তসাপেক্ষ দায়মুক্তি, নোটিশ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা, স্থানীয় প্রতিনিধি এবং অর্থ ও ডেলিভারি যে প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ করে তার জন্য যৌথ দায়ের বিধান এখানে অপরিহার্য।
খসড়ায় পেমেন্ট গেটওয়ে ও কুরিয়ার সার্ভিসের সংজ্ঞা আছে, কিন্তু তাদের কোনো দায়িত্ব নেই। অথচ অনলাইন লেনদেনের শৃঙ্খলে এরাই টাকা ও পণ্যের বাহক। বিতর্কিত লেনদেনে অর্থ ফেরত চাওয়ার (চার্জব্যাক) প্রক্রিয়া, ডেলিভারির প্রমাণ সংরক্ষণ এবং পণ্য ফেরত পাঠানোর লজিস্টিক্স বিধিমালায় স্পষ্ট করা গেলে ভোক্তার বাস্তব সুরক্ষা অনেক বাড়ত।
অধিকারের জায়গা ফাঁকা
নতুন ধারাগুলোর তালিকায় নিবন্ধন, নিষেধাজ্ঞা ও দণ্ডের ছড়াছড়ি; কিন্তু ভোক্তা কী পাবেন, সে বিষয়ে নতুন কোনো ধারা চোখে পড়ে না। ইউরোপে দূরবর্তী ক্রয়ে ১৪ দিনের মধ্যে কারণ না দেখিয়ে চুক্তি বাতিলের অধিকার আছে; দক্ষিণ কোরিয়ার ই-কমার্স আইনে আছে সাত দিনের প্রত্যাহার-সুযোগ। ভারতের বিধিমালা অযৌক্তিক বাতিলকরণ ফি নিষিদ্ধ করেছে। খসড়ায় ফেরত, প্রতিস্থাপন, রিফান্ডের সময়সীমা এবং ক্যাশ অন ডেলিভারির বাইরে আগাম অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে জামানত বা ‘এসক্রো’ পদ্ধতির মতো ব্যবস্থার ইঙ্গিতও নেই। ভোক্তার চোখে অনলাইন কেনাকাটার প্রধান ঝুঁকি আগাম টাকা; তাই এখানেই আইনের প্রথম দুর্গ হওয়া উচিত।
আচরণগত অর্থনীতির গবেষণা দেখায়, ‘মাত্র দুটি আছে’ ধরনের কৃত্রিম তাড়না, ভুয়া রিভিউ এবং এক ক্লিকে সাবস্ক্রিপশন ধরিয়ে দেওয়ার কৌশল ভোক্তার সিদ্ধান্তকে নীরবে বাঁকিয়ে দেয়। ভারত ২০২৩ সালে এ ধরনের ‘ডার্ক প্যাটার্ন’ নিষিদ্ধ করে নির্দেশিকা জারি করেছে; যুক্তরাজ্যের ডিজিটাল মার্কেটস, কমপিটিশন অ্যান্ড কনজিউমার্স অ্যাক্ট (২০২৪) ভুয়া রিভিউ নিষিদ্ধ করেছে ও সাবস্ক্রিপশনের নিয়ম কঠোর করেছে। ফেসবুকনির্ভর বাংলাদেশি বাজারে এ চর্চা অপরিচিত নয়; খসড়ায় এর নামগন্ধও নেই।
অর্থনীতির ভাষায়, যেখানে ক্রেতা পণ্যের মান আগে যাচাই করতে পারেন না, সেখানে তথ্যের অসমতা ভালো বিক্রেতাকে বাজার থেকে সরিয়ে দেয়। আস্থা-অবকাঠামো তাই ‘সার্বজনীন পণ্য’—এর খরচ রাষ্ট্র ও প্ল্যাটফর্মকে ভাগ করে নিতে হয়।
ক্রেতার ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাও অনলাইন ভোক্তা-সুরক্ষার অংশ। ঠিকানা, ফোন নম্বর ও পেমেন্ট তথ্য প্ল্যাটফর্ম ও বিক্রেতাদের কাছে জমা থাকে; ফাঁস হলে ক্ষতি অর্থের বাইরেও যায়। খসড়ায় ক্রেতার তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার ও সংরক্ষণের ন্যূনতম শর্তের উল্লেখ দেখা যায় না; অন্তত তথ্য-সুরক্ষা আইনের সঙ্গে সমন্বয়ের একটি সংযোগ-ধারা রাখা দরকার।
৫৬ক ধারা: অসম ক্ষমতার ঝুঁকি
বারবার অভিযোগ পাওয়া গেলে এবং ‘অসৎ উদ্দেশ্য আছে মর্মে অধিদপ্তরের বিশ্বাস হলে’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় প্রতিষ্ঠানের পেমেন্ট গেটওয়ে বা ব্যাংক হিসাবের লেনদেন সাময়িক স্থগিত করা যাবে—এটি খসড়ার সবচেয়ে সাহসী ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধারা। প্রতারকদের মুখোশ খুলতে দ্রুত ব্যবস্থার দরকার আছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু ‘বিশ্বাস’ একটি ব্যক্তিনিষ্ঠ মানদণ্ড; স্থগিতাদেশের সর্বোচ্চ মেয়াদ, আগাম শুনানি, লিখিত কারণ ও স্বাধীন পর্যালোচনার ব্যবস্থা ধারাটিতে নেই। প্রতিযোগীর সাজানো অভিযোগে একটি সৎ ব্যবসা রাতারাতি অচল হতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যে এমন অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন বা দ্রুত বিচারিক পর্যালোচনা থাকে। বিকল্প হিসেবে ‘পেমেন্ট হোল্ডব্যাক’, অর্থাৎ ডেলিভারি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মের কাছে অর্থ ধরে রাখা, অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ।
প্রাসঙ্গিকতা হারানো সংযোজন
৩৯ক ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া ডিজিটাল গিফট কার্ড, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ক্যাশ ভাউচার তৈরি, বিক্রি বা ব্যবহারে এক বছর কারাদণ্ড বা দুই লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়েছে। এটি পেমেন্ট ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিষয়। ভোক্তা-আইনে এমন ঢালাও ভাষা দৈনন্দিন খুচরা ব্যবসার ডিসকাউন্ট ভাউচারকেও ফৌজদারি ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
সুপারিশ
ডিজিটাল কমার্স ও ডিজিটাল ডিভাইসের সংজ্ঞা প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ ও কার্যভিত্তিক করা প্রয়োজন। নিষিদ্ধ কার্যক্রমকে সংজ্ঞার বর্জন-তালিকায় না রেখে সংশ্লিষ্ট আইনে নিষিদ্ধ করার বিধান রাখতে হবে। নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় স্তরভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে—প্ল্যাটফর্মের জন্য লাইসেন্স, মাঝারি বিক্রেতার জন্য নিবন্ধন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিনামূল্যের অনলাইন নিবন্ধন; পাশাপাশি বিক্রেতার পরিচয় যাচাইয়ের দায়িত্ব প্ল্যাটফর্মের ওপর দিতে হবে।
খসড়ায় প্ল্যাটফর্মের দায় নির্ধারণে পৃথক অধ্যায় যুক্ত করা প্রয়োজন। এতে অভিযোগ কর্মকর্তা নিয়োগ, অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, নির্দিষ্ট শর্তে যৌথ দায় এবং বিদেশি প্ল্যাটফর্মের স্থানীয় প্রতিনিধি রাখার বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। একই সঙ্গে ভোক্তার প্রত্যাহার ও পণ্য ফেরতের অধিকার, রিফান্ডের নির্দিষ্ট সময়সীমা, মূল্য ও অতিরিক্ত খরচের স্বচ্ছতা এবং প্রতারণামূলক ডিজিটাল নকশা বা ‘ডার্ক প্যাটার্ন’ নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করতে হবে।
৫৬ক ধারায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের শুনানি, লিখিতভাবে সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ এবং স্বাধীন পর্যালোচনার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে, ৩৯ক ধারার বিষয়বস্তু আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার এখতিয়ারভুক্ত আইনে অন্তর্ভুক্ত করাই অধিকতর যুক্তিসংগত। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর এখতিয়ার স্পষ্ট হবে এবং ডিজিটাল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের নামে অপ্রয়োজনীয় কর্তৃত্বের পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব হবে।
শেষ কথা
অনলাইন বাজার আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আইন যদি কেবল তালিকা তৈরি করে আর দায়ের কাঠামো না গড়ে, তাহলে সৎ উদ্যোক্তা চাপে পড়বেন, প্রতারক সরে যাবেন, আর ভোক্তা একই জায়গায় থেকে যাবেন। সংশোধনের এখনও সুযোগ আছে; নীতিনির্ধারকদের উচিত সেই সুযোগ কাজে লাগানো। ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে ভোক্তার আস্থা আগে গড়তে হয়। আস্থা মানে কঠোর শাস্তির ভয় নয়; আস্থা মানে জানা যে, ভুল হলে প্রতিকার সহজ, দ্রুত ও নিশ্চিত। খসড়াটিকে সেই মানদণ্ডে পৌঁছাতে হবে।
লেখক:এম এম মুসা, গবেষক ও সাংবাদিক।
প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]

