ঘুমালে কি আসলেই স্বপ্ন দেখেন না, নাকি ভুলে যান? বিজ্ঞান কী বলছে

ঘুমের রাজ্যে স্বপ্নের আনাগোনা মানুষের মনের এক চিরন্তন রহস্য। অবচেতন মনের নানা কল্পনা, ভাবনা কিংবা ভয় ঘুমের ঘোরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তবে আশপাশের অনেকের মুখেই শোনা যায় একটি সাধারণ কথা—তারা নাকি ঘুমালে কখনোই কোনো স্বপ্ন দেখেন না। রাতের পর রাত কি সত্যিই কারও মনের ক্যানভাস পুরোপুরি শূন্য থাকতে পারে?
বিজ্ঞান কিন্তু এ ধারণাকে সরাসরি নাকচ করে দিচ্ছে। ঘুম ও মস্তিষ্ক নিয়ে হওয়া বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ প্রায় সব মানুষই প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখেন। কেউ যদি মনে করেন তিনি স্বপ্ন দেখছেন না, তার অর্থ এই নয় যে মস্তিষ্ক স্বপ্ন তৈরি করেনি; বরং তিনি তা মনে রাখতে পারছেন না।
স্বপ্ন কখন ও কীভাবে তৈরি হয়?
ঘুমের কয়েকটি নির্দিষ্ট পর্যায় রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘র্যাপিড আই মুভমেন্ট’ বা রেম (REM) স্লিপ। মানুষ যখন ঘুমের এই স্তরে পৌঁছায়, তখন মস্তিষ্কের কর্মতৎপরতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। রঙিন, দীর্ঘ ও স্পষ্ট দৃশ্যগুলো সাধারণত এই ধাপেই দেখা যায়।
বিছানায় যাওয়ার প্রায় ৯০ মিনিট পর মানুষের প্রথম রেম স্লিপ শুরু হয়। রাতের ঘুম যত গভীর হতে থাকে, এই রেম পর্যায়ের স্থায়িত্বও ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।
তাহলে কেন মনে হয় কোনো স্বপ্ন দেখিনি?
সাধারণত একজন ব্যক্তি প্রতি রাতে চার থেকে ছয়টি স্বপ্ন দেখে থাকেন। তবে ঘুম ভাঙার পর এর প্রায় সবই স্মৃতির পাতা থেকে মুছে যায়। কেবল জেগে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে যে স্বপ্নটি দেখা হয়, সেটিই মানুষের মনে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
গবেষকদের মতে, ঘুমের রেম পর্যায়ে মানুষের নতুন স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষমতা বেশ দুর্বল থাকে। ফলে ওই সময়ে দেখা দৃশ্যগুলো মস্তিষ্ক স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে পারে না। মূলত দুটি কারণে এমনটা ঘটে—প্রথমত, শারীরিক বা মানসিক কারণে কারও রেম স্লিপের সময় কমে যাওয়া; দ্বিতীয়ত, স্বপ্ন দেখার পরপরই তা ভুলে যাওয়া।
স্বপ্ন ভুলে যাওয়ার পেছনে যেসব কারণ কাজ করে
স্বপ্ন দেখা এবং তা মনে রাখতে পারা অনেকটাই নির্ভর করে মানুষের জীবনযাপন ও মানসিক পরিস্থিতির ওপর। বেশ কিছু কারণে স্বপ্নের স্মৃতি দ্রুত উবে যায়:
মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা: অতিরিক্ত মানসিক অস্থিরতা ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। এতে ঘুম বারবার ভেঙে যায় এবং গভীর বা রেম স্লিপের সময়সীমা কমে আসে। আবার অনেকে দুঃস্বপ্ন দেখে আঁতকে ওঠেন, যা মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয় এবং রাতের অন্য স্বপ্নগুলো ভুলিয়ে দেয়।
অনিয়মিত ঘুম: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে না ঘুমানো কিংবা দীর্ঘক্ষণ রাত জাগার অভ্যাস থাকলে শরীর পর্যাপ্ত রেম স্লিপ পায় না। ঘুমের চক্র ব্যাহত হলে স্বাভাবিকভাবেই স্বপ্ন দেখার বা মনে রাখার সুযোগ কমে আসে।
শারীরিক জটিলতা ও রোগব্যাধি: স্লিপ অ্যাপনিয়া বা ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় যাদের বারবার ঘুম ভাঙে, তাদের ঘুম গভীর হতে পারে না। পাশাপাশি বিষণ্ণতা এবং থাইরয়েডের মতো হরমোনজনিত সমস্যার কারণেও ঘুমের মান কমে যায়।
বাজে অভ্যাস: ঘুমানোর আগে মদ্যপান দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করলেও রাতের শেষভাগে রেম স্লিপ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একইভাবে রাতে অতিরিক্ত চা-কফি পানের মাধ্যমে ক্যাফেইন গ্রহণ কিংবা ধূমপান স্নায়ুকে উত্তেজিত রাখে, যা গভীর ঘুমের অন্তরায়।
ওষুধের প্রভাব: উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্ণতা কিংবা অ্যালার্জির জন্য নিয়মিত যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রেম স্লিপের ব্যাপ্তি কমে যেতে পারে। ফলে স্বপ্ন মনে রাখার ক্ষমতা হ্রাস পায়।
স্বপ্ন মনে রাখার কিছু সহজ কৌশল
কেউ যদি রাতে দেখা স্বপ্নগুলো মনে রাখতে চান, তবে দৈনন্দিন রুটিনে কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি বা স্লিপ সাইকেল নিয়ন্ত্রণে থাকে। শোবার ঘরের পরিবেশ শান্ত, অন্ধকার এবং আরামদায়ক রাখা জরুরি, যাতে কোনো কোলাহল ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটায়। এছাড়া ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ কিংবা টিভির মতো ডিজিটাল পর্দার নীল আলো থেকে দূরে থাকা দরকার। কারণ এই নীল আলো ঘুমের সহায়ক হরমোন মেলাটোনিন উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে।

