কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, বেকারত্ব ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকা তরুণদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়ায়। দ্রুত টাকা আয়ের আশায় শুরু হলেও অনেকের জন্য তা শেষ হচ্ছে ঋণ, পারিবারিক সংকট ও নানা অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করে।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে প্রায় নয় বছর আগে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেন জাহেদুল্লাহ। ক্যাম্পের একটি প্রকল্পে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। ২০২২ সালে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কর্মহীন হয়ে পড়েন। নতুন কাজ না থাকায় এক বন্ধুর দোকানে বসে সময় কাটানোর সময় ওই বন্ধুর প্ররোচনায় অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি।
শুরুর দিকে জুয়া খেলে লাভও করেন জাহেদুল্লাহ। এক লাখ টাকা দিয়ে শুরু করে একপর্যায়ে তার হাতে আসে সাড়ে সাত লাখ টাকা। কিন্তু সেই অর্থ ধরে রাখতে পারেননি। মাত্র এক মাসের মধ্যে পুরো টাকা হারিয়ে ফেলেন তিনি।
এরপরও জুয়া ছাড়েননি। হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় স্ত্রীর গয়না বিক্রি করেন। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও ধার নেন। সব মিলিয়ে আরও প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা জুয়ার অ্যাকাউন্টে জমা দেন। শেষ পর্যন্ত সেই অর্থও হারিয়ে দেন।
এক পর্যায়ে ছোট সন্তানের কথা ভেবে জুয়া থেকে বেরিয়ে আসেন জাহেদুল্লাহ। তবে ততদিনে তার মাথায় চেপে বসেছে বড় অঙ্কের ঋণ।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জাহেদুল্লাহ জানান, তখন তার একটি সন্তান ছিল। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুশোচনা হতো। পরে মালয়েশিয়ায় থাকা ভাইয়ের কাছ থেকে ধার এবং মিয়ানমারে থাকা সঞ্চয়ের অর্থ এনে ঋণের একটি বড় অংশ পরিশোধ করেন তিনি।
প্রায় সাত মাস অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে জাহেদুল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বেশ কিছু অনলাইন জুয়ার সাইটের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এসব সাইটে টাকা জমা ও উত্তোলন করা হয়। বড় অঙ্কের লেনদেনে ক্যাম্পের বাইরের স্থানীয় লোকজনেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানান তিনি।
জুয়ার সঙ্গে বাড়ছে অপরাধের যোগসূত্র
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে অনলাইন জুয়ার যোগসূত্রের কথা বলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও।
ইউএনএইচসিআরের ‘জয়েন্ট প্রটেকশন মনিটরিং’ প্রতিবেদনে অনলাইন জুয়ার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্থিক সংকট ও জীবিকার সীমাবদ্ধতার কারণে তরুণদের মধ্যে উচ্চ আসক্তির অনলাইন জুয়া বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর। একই সঙ্গে দায়দেনা নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিরোধ এবং শারীরিক সহিংসতার ঘটনাও বাড়ছে।
চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, শারীরিক নির্যাতন, গোলাগুলি এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগদানের মতো ৪৭০টি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে ইউএনএইচসিআর। এসব ঘটনায় ৫৯২ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী ভুক্তভোগী হয়েছেন। এর আগে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে ৪৫৫টি ঘটনায় ভুক্তভোগী হন ৮৩২ জন।
কর্মক্ষম বিপুলসংখ্যক মানুষকে দীর্ঘদিন সীমিত পরিসরের মধ্যে বেকার অবস্থায় থাকতে হওয়ায় ক্যাম্পে অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ঋণের বোঝা থেকে অপহরণের নাটক
অনলাইন জুয়ায় অর্থ হারিয়ে ঋণের চাপে পড়ার পর কেউ কেউ নিজেই অপহরণের নাটক সাজিয়ে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গত ৮ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের চার নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি খেলার মাঠের কাছ থেকে নবী হোসেন নামে এক রোহিঙ্গাকে বিবস্ত্র ও রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
নবী হোসেনের এক আত্মীয়ের ভাষ্য, ধারদেনা করে জুয়ায় টাকা হারানোর পর পরিবারের কাছে অর্থ চেয়েছিলেন তিনি। পরিবার থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়ার পর তাকে অপহরণ করা হয়েছে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে তাকে মারধরের শিকার হতে হয়।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) কর্মকর্তারাও জুয়া ও ঋণের সঙ্গে এ ধরনের ঘটনার সম্পর্কের কথা বলছেন।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক মোহাম্মদ সিরাজ আমীন বলেন, ক্যাম্পে সংঘটিত অনেক অপহরণের ঘটনায় দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আগে ঋণ করেছেন কিংবা জুয়ায় টাকা হারিয়েছেন। পরে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য নিজেরাই অপহরণের ঘটনা সাজানোর চেষ্টা করেন।
ভিপিএন ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নজরদারির সীমাবদ্ধতা
ক্যাম্পে অনলাইন জুয়া বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এপিবিএনের কর্মকর্তারা বলছেন, জুয়ার সাইট ব্যবহারকারীদের অনেকে ভিপিএন ব্যবহার করায় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ক্যাম্পে ব্যবহৃত অনেক মোবাইল সিমও স্থানীয় বাসিন্দাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে নিবন্ধিত বলে জানিয়েছেন এপিবিএনের কর্মকর্তারা। ফলে প্রকৃত ব্যবহারকারী শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
সিরাজ আমীন বলেন, ক্যাম্পের ভেতর থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন হলেও সেই অর্থ অন্য এলাকায় গিয়ে ক্যাশআউট হতে পারে। ফলে লেনদেনের পুরো চক্র শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ক্যাম্পের যেসব এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক তুলনামূলক ভালো, সেখানে জুয়ায় অংশ নিতে লোকজন জড়ো হন বলেও জানিয়েছেন শরণার্থীরা। এসব এলাকায় মাঝেমধ্যে ক্যাম্প ইনচার্জের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয় বলে জানান এপিবিএন কর্মকর্তারা।
বিকল্প ব্যস্ততার উদ্যোগ
জাহেদুল্লাহর মতো অনেক তরুণই কর্মহীনতার সময় অনলাইন জুয়ার দিকে ঝুঁকেছেন। তবে জুয়া ছেড়ে দেওয়ার কয়েক মাস পর একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে সেখানেই কর্মরত আছেন।
ক্যাম্পে তরুণদের অলস সময় কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। অক্সফ্যামের সহযোগিতায় কয়েকটি লার্নিং সেন্টারে ক্যারিকুলামের বাইরের বই নিয়ে লাইব্রেরি গড়ে তুলেছেন রোহিঙ্গা তরুণরা।
চার নম্বর ক্যাম্পের ‘নিউ লাইট অব রোহিঙ্গা’ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক সাদেক হোসেন জানান, সেখানে প্রায় ৪০০ শিশু ও তরুণ যুক্ত রয়েছে। বই পড়া ও বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তারা অনলাইন জুয়া ও অন্যান্য অপরাধ থেকে দূরে থাকতে পারছে বলে মনে করেন তিনি।
রোহিঙ্গা তরুণদের মধ্যে অনলাইন জুয়ার বিস্তারকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে সাদেক হোসেন বলেন, তাদের করার মতো কাজের সুযোগ কম থাকায় অনেকেই জুয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে কক্সবাজার ও ভাসানচর মিলিয়ে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন। তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু।
জুলাই পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, ১৮ বছরের বেশি বয়সী রোহিঙ্গার সংখ্যা ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫৭ জন। আর নবজাতক থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৬ লাখ ২৬ হাজার ৪৭৭ জন। শিশুদের মধ্যে ১১ বছরের কম বয়সী ৪ লাখ ৫০ হাজার ৫১৮ জন।
ক্যাম্পে কয়েক হাজার লার্নিং সেন্টার ও মাদ্রাসায় মিয়ানমারের কারিকুলাম অনুযায়ী পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক শিশুর ভবিষ্যৎ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের জীবিকার সুযোগ তৈরির বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা পরামর্শ দিলেও দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা নিয়মিত সংবাদমাধ্যমে এলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মনে করেন সরকারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান।
তিনি বলেন, মিয়ানমারে দীর্ঘদিন সহিংসতার মধ্যে বেড়ে ওঠা এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই শিক্ষা, মৌলিক অধিকার ও কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তাদের অনেক পরিবারই সহিংসতার কারণে স্বজন হারিয়েছে বা নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে আরও বড় ধরনের অপরাধপ্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এপিবিএনের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও কাজ করছে বলে জানিয়েছেন মিজানুর রহমান। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান, সীমিত কর্মসংস্থান এবং প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত থাকায় ভবিষ্যতে অপরাধ ও অনলাইন জুয়ার মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় আরও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


