লোগো
Advertisement

পদ্মায় ফেরির ইঞ্জিন বিকল, আতঙ্কে যাত্রীরা; নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৪ এএম
Advertisement

উত্তাল পদ্মায় মাঝনদীতে ফেরির ইঞ্জিন বিকল হয়ে স্রোতের টানে ভেসে যাওয়ার ঘটনায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে চলাচলকারী যাত্রীদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। বিশেষ করে গত ৭ সেপ্টেম্বর রো-রো ফেরি ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান’ কয়েক কিলোমিটার স্রোতের টানে ভেসে যাওয়ার পর এই নৌপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রতিদিন এই রুট দিয়ে হাজারো যাত্রী ও বিপুলসংখ্যক যানবাহন পারাপার হয়। তবে মাঝনদীতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কীভাবে ফেরি থেকে নিরাপদে বের হতে হবে, কোথায় লাইফ জ্যাকেট পাওয়া যাবে কিংবা পানিতে পড়ে গেলে কী করণীয়—এসব বিষয়ে যাত্রীদের অনেকেই জানেন না।

যাত্রীদের অভিযোগ, ফেরিতে ওঠার পর জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে তাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না। ফলে ফেরির যান্ত্রিক ত্রুটির পাশাপাশি জরুরি সময়ে যাত্রীদের প্রস্তুতির অভাবও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

স্রোতের টানে ভেসে যায় ফেরি

গত ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে পাটুরিয়া ঘাট থেকে দৌলতদিয়া যাওয়ার পথে রো-রো ফেরি ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান’ মাঝ পদ্মায় পৌঁছালে তীব্র স্রোতের মধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এতে ফেরিটি স্বাভাবিকভাবে চলতে পারেনি।

একপর্যায়ে স্রোতের টানে ফেরিটি প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে ভেসে যায়। এতে ফেরিতে থাকা যাত্রী ও যানবাহনের চালকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় চার ঘণ্টা পর ফেরিটিকে উদ্ধার করে পাটুরিয়া ঘাটে ফিরিয়ে আনা হয়।

ফেরির মাস্টার মো. নাসির উদ্দিন জানান, ছোটখাটো যান্ত্রিক ত্রুটিও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওইদিন ফেরি ‘হামিদুর রহমানের’ হাইড্রোলিক পাইপ ফেটে যাওয়ায় ফেরিটি ঘাটে ফিরতে পারেনি। পরে অন্য একটি জাহাজের সহায়তায় সেটিকে তীরে নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, যান্ত্রিক ত্রুটি হঠাৎ করেই দেখা দিতে পারে। তাই ফেরিগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি পরীক্ষা যথাযথভাবে করা জরুরি।

‘বিপদে পড়লে কী করব, জানি না’

মাগুরা থেকে আসা যাত্রী গফুর মোল্লা বলেন, মাঝনদীতে ফেরিতে দুর্ঘটনা ঘটলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে যাত্রীদের কোনো ধারণা দেওয়া হয় না। কোথায় লাইফ জ্যাকেট রাখা থাকে বা কীভাবে তা ব্যবহার করতে হবে—সেটিও অনেকের জানা নেই।

তিনি বলেন, পানিতে পড়ে গেলে কীভাবে দ্রুত নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে হবে, সে বিষয়েও যাত্রীদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না। ফলে হঠাৎ বিপদে পড়লে সবাইকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হবে।

আরেক যাত্রী শফিকুল ইসলাম বলেন, মাঝ পদ্মায় কিংবা ঘাটের কাছাকাছি ফেরির ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কখনো কখনো কয়েক ঘণ্টা পর ফেরি ঘাটে পৌঁছায়।

তিনি বলেন, “মাঝনদীতে থাকলে আমরা আতঙ্কে থাকি। কখন কী ঘটে বলা যায় না। ফেরিতে ওঠার আগে বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু দুর্ঘটনা হলে কী করতে হবে, তা কেউ জানায় না। যাত্রীদের আগেই এসব বিষয়ে জানানো দরকার।”

উদ্ধার প্রস্তুতির কথা সংশ্লিষ্টদের

তবে মাঝ পদ্মায় ফেরি দুর্ঘটনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, ফেরি বা ফেরিঘাট এলাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার খবর পেলে গোয়ালন্দ ফায়ার স্টেশনের দল দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরি দলও উদ্ধার কাজে অংশ নিতে পারে।

তিনি জানান, আরিচা ঘাটে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল রয়েছে। স্পিডবোটে করে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারবেন। আরিচায় ছয়জন এবং ফরিদপুরে তিনজন ডুবুরি রয়েছেন। প্রয়োজনে ঢাকা থেকেও অতিরিক্ত ডুবুরি আনা সম্ভব বলে জানান তিনি।

বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট শাখার এজিএম মো. সালাহউদ্দিন বলেন, নৌরুটে চলাচলকারী প্রতিটি ফেরির ফিটনেস ও সার্ভে সনদ রয়েছে। সনদধারী নাবিকরাই ফেরিগুলো পরিচালনা করছেন।

তিনি বলেন, ফেরি বা ঘাটে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী, ডুবুরি, স্পিডবোট এবং উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’সহ প্রয়োজনীয় নৌযান প্রস্তুত রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের উদ্ধার প্রস্তুতির পাশাপাশি যাত্রীদের জরুরি নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া এবং ফেরির যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর দাবি জানিয়েছেন নৌপথ ব্যবহারকারীরা।

আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...