মোংলা বন্দরে প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে খানজাহান আলী মাজারের পথে প্রধানমন্ত্রী

এরপর প্রধানমন্ত্রী ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদির সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ (Expansion and Modernization of Mongla Port Facilities) শীর্ষক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ১০ ও ১১ নম্বর জেটি নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো ও সুবিধাদি গড়ে তোলা হবে।
প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং নির্মাণকাল চার বছর। এর আওতায় দুটি আধুনিক জেটি, কনটেইনার লোডিং-আনলোডিং ইয়ার্ড, বিপজ্জনক কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড, ৪৯টি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি নিরাপদে কনটেইনার সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি হবে।
প্রকল্পের মোট এলাকা ২ লাখ ২৭ হাজার বর্গমিটার। এর মধ্যে লোডেড কনটেইনার ইয়ার্ড ৮৭ হাজার ৬০০ বর্গমিটার, এমটি কনটেইনার ইয়ার্ড ৩৪ হাজার ১৭০ বর্গমিটার, ডেঞ্জারাস কনটেইনার ইয়ার্ড ৪ হাজার ২৬০ বর্গমিটার, অভ্যন্তরীণ সড়ক ৫০ হাজার ৪০০ বর্গমিটার, প্রশাসনিক ভবন ২ হাজার ৫১৭ বর্গমিটার এবং কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন (সিএফএস) ৩ হাজার ৯০৯ বর্গমিটার।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা প্রতি ঘণ্টায় ৩০টিতে উন্নীত হবে এবং বছরে চার লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা অর্জিত হবে। একই সঙ্গে মোংলা বন্দর বাংলাদেশের প্রথম স্মার্ট বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাবে। ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী অটোমেটেড সিস্টেম বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ কার্যক্রম সহজীকরণেও ভূমিকা রাখবে প্রকল্পটি। এতে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ব্যয় তুলনামূলকভাবে কমবে।
ইতোমধ্যে মোংলা বন্দরে বহুমাত্রিক পরিবহন সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নতুন অবকাঠামো যুক্ত হলে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), তাজা খাদ্যপণ্য আমদানিকারক, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন, শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনসহ বন্দরের বিভিন্ন ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী স্বতন্ত্র কনটেইনার হ্যান্ডলিং সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পটির ইতিহাস তুলে ধরে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর চীনের রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফরকালে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তিতে মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান CCECC-এর সঙ্গে জি-টু-জি পদ্ধতিতে চীনা অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়।
প্রকল্পটির অর্থায়নের বিষয়ে ২০২৬ সালের ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন এজেন্সি (CIDCA) এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ERD) মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ও চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (চায়না এক্সিম ব্যাংক) মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা সমপরিমাণ ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন ফারুক ও কমিটির সদস্যরা।
এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, নৌপরিবহন সচিব মো. আতাউর রহমান খান, চীনের সিআরসিসির চেয়ারম্যান (ভাইস মিনিস্টার পদমর্যাদা) Dai Hegen, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের ইকোনমিক অ্যান্ড কমার্শিয়াল কাউন্সেলর Song Yang এবং CCECC-এর চেয়ারম্যান Li Chongyang। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা।
বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরে জাহাজের সংখ্যা বাড়বে, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা সরাসরি সুফল পাবেন। পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৃহৎ অবকাঠামো ও শিল্প উন্নয়ন প্রকল্পে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হবে।
এছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা জোরদার এবং জাতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নে মোংলা বন্দর আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত চীনা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও আধুনিক বন্দর অবকাঠামোর সমন্বয়ে ভবিষ্যতে মোংলা সামুদ্রিক বাণিজ্য, শিল্প বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক লজিস্টিকস কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলের কাছেই একটি বৃক্ষরোপণ করেন। পরে প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নসহ দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নতি কামনায় দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
মোংলা বন্দরের অনুষ্ঠান শেষ করে প্রধানমন্ত্রী এখন সড়কপথে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার শরিফের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। সফরসূচি অনুযায়ী, দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে তার মাজার শরিফে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখানে জিয়ারত শেষে দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে খুলনার উদ্দেশে রওনা দেবেন তিনি। বিকেলে খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২-এর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।

