জার্মানিতে শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। সেপ্টেম্বর থেকে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হওয়ায় বাড়ছে বাসার চাহিদা। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনে ভুয়া বাসার বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অগ্রিম ভাড়া ও জামানতের নামে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র।
শুধু বাংলাদেশি নয়, বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরাও এ ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শিক্ষার্থী আবাসনসংক্রান্ত গ্রুপ, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে এসব প্রতারণা করা হচ্ছে।
এরই শিকার হয়েছেন ঢাকার জামিলুর রহমান। জার্মানির বার্লিনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হওয়া জামিলুর সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে দীর্ঘদিন বাসা খুঁজছিলেন। একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গ্রুপে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়।
ওই ব্যক্তি জামিলুরকে একটি বাসার ছবি ও তথ্য পাঠিয়ে দুই মাসের অগ্রিম ভাড়া হিসেবে ১২০০ ইউরো দাবি করেন। ভাড়া তুলনামূলক কম হওয়ায় বাসাটি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ থেকেই টাকা পাঠিয়ে দেন জামিলুর।
১৫ সেপ্টেম্বর বার্লিনে পৌঁছে যোগাযোগের চেষ্টা করলে ওই ব্যক্তির আর কোনো সাড়া পাননি তিনি। একই সঙ্গে বাসার বিজ্ঞাপনের লিংকটিও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে জামিলুর জানতে পারেন, সেখানে আগে থেকেই অন্য একজন ভাড়াটে বসবাস করছেন।
একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন চট্টগ্রামের শারমিন আক্তার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে জার্মানির কটবুসে স্নাতকোত্তর পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। ফেসবুকের একটি শিক্ষার্থী আবাসন গ্রুপে স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন শারমিন।
ছবিতে আকর্ষণীয় বাসা এবং তুলনামূলক কম ভাড়া দেখে তার সন্দেহ হয়নি। কথিত চুক্তিপত্রও পাঠানো হয় তাকে। পরে অগ্রিম হিসেবে প্রায় ৮৫০ ইউরো পাঠানোর পরদিনই বিজ্ঞাপনদাতার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যায়। জার্মানিতে পৌঁছে শারমিন জানতে পারেন, ওই ঠিকানায় কোনো খালি ফ্ল্যাটই নেই। পরে বাধ্য হয়ে সাময়িকভাবে একটি বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে থাকতে হয় তাকে।
ফ্রাঙ্কফুর্টে থাকা রাকিবুল হাসানের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। হোয়াটসঅ্যাপে পরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি রুম ভাড়া নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ভিডিওকলে বাসাটি দেখানো হওয়ায় বিষয়টি তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। জার্মানিতে যাওয়ার আগেই জামানতের টাকা পাঠিয়ে দেন রাকিবুল।
কিন্তু নির্ধারিত দিনে ঠিকানায় গিয়ে তার ভুল ভাঙে। সেখানে আবাসিক ফ্ল্যাটের বদলে একটি অফিস ভবন দেখতে পান তিনি। এরপর যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অফিসের সহায়তায় সাময়িক থাকার ব্যবস্থা করতে হয় তাকে।
হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমরান হোসাইন বলেন, জার্মানিতে নতুন আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই বাসা নিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তার ভাষায়, দেশটিতে বর্তমানে বাসা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এই সংকটকে প্রতারকরা কাজে লাগাচ্ছে।
ইমরান পরামর্শ দিয়ে বলেন, জার্মানিতে যাওয়ার আগে অনলাইনে কোনো অপরিচিত ব্যক্তিকে টাকা না পাঠানোই নিরাপদ। সম্ভব হলে জার্মানিতে অবস্থানরত পরিচিত ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাসার তথ্য যাচাই করে অর্থ লেনদেন করা উচিত।
জার্মানির বার্লিনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত জাহিদ কবির হিমনও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি জানান, সম্প্রতি তার এক বন্ধুও বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বাড়ির মালিক পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, তিনি ব্যক্তিগত কাজে আয়ারল্যান্ডে অবস্থান করছেন। তাই অগ্রিম টাকা আয়ারল্যান্ডের একটি ব্যাংক হিসাবে পাঠাতে বলা হয়।
টাকা পাঠানোর পর বাড়ির চাবি পাঠানো হলেও পরে দেখা যায়, সেটি আসল চাবি নয়।
জাহিদ কবির হিমন বলেন, বিদেশে আসার প্রস্তুতির সময় শুধু সুন্দর ছবি বা কম ভাড়ার বিজ্ঞাপন দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে অন্য দেশের ব্যাংক হিসাবে অগ্রিম টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। পরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছাড়া অর্থ লেনদেন না করার পরামর্শ দেন তিনি।
জার্মানিতে নতুন শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে অনলাইনভিত্তিক এ ধরনের প্রতারণা বাড়ায় শিক্ষার্থীদের বাসা ভাড়া নেওয়ার আগে বিজ্ঞাপনদাতা, ঠিকানা, চুক্তিপত্র ও অর্থ গ্রহণের তথ্য ভালোভাবে যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।


