বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী। চরম আবহাওয়া, ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে বিঘ্নের কারণে খাদ্যশস্য, চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও স্থানীয় বাজারেও। একই সময়ে দেশের উৎপাদনশীল শিল্প খাত উচ্চ ঋণব্যয়, জ্বালানি সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা—এফএওর (FAO) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যসূচক ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে উঠেছে। জুলাইয়ের সংশোধিত ১৩০ দশমিক ৮ পয়েন্টের তুলনায় এ সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর এটিই সূচকটির সর্বোচ্চ অবস্থান। তবে ২০২২ সালের মার্চের রেকর্ড সর্বোচ্চ অবস্থানের তুলনায় সূচকটি এখনো ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ নিচে রয়েছে।
আগস্টে সূচকের আওতাভুক্ত পাঁচটি পণ্যগোষ্ঠীর সব কটির দামই আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। এর মধ্যে চিনির দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এফএওর চিনি মূল্যসূচক এক মাসে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১০৬ দশমিক ৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে খাদ্যশস্যের মূল্যসূচক বেড়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ভোজ্যতেলের মূল্যসূচক ০ দশমিক ৬ শতাংশ। এফএও বলছে, প্রতিকূল আবহাওয়া, উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নই এসব মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
দেশের বাজারেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব দেখা যাচ্ছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মতো বড় পাইকারি বাজারে সরবরাহের টানাপোড়েন তৈরি হলে চিনিসহ আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয় স্থানীয় পরিবহন, আমদানি, অর্থায়ন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বাড়তি ব্যয়। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে ভোক্তার ওপর।
এ পরিস্থিতি শুধু আমদানি বাড়িয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। খাদ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে দেশের উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহ সক্ষমতাও সচল রাখা জরুরি। কারণ খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে কৃষক, শ্রমিক, কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহনকর্মী, ডিলার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের বড় একটি নেটওয়ার্ক।
একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। উৎপাদন কমে গেলে কাঁচামালের চাহিদা, কর্মসংস্থান, পরিবহন, ব্যাংকঋণ এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
এদিকে দেশের বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে স্বল্পসুদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রাইভেট ইকোনমিক জোনস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (PEZAB) সম্প্রতি প্রথম ধাপে ৫ হাজার কোটি টাকা এবং পর্যায়ক্রমে ১০ হাজার কোটি টাকার সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।
সংগঠনটির প্রস্তাব অনুযায়ী, উদ্যোক্তাদের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ১৫ বছরের জন্য ঋণ দেওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে চার বছর গ্রেস পিরিয়ড রাখার প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্প ব্যয়ের ৩০ শতাংশ উদ্যোক্তার নিজস্ব অর্থায়ন এবং বাকি ৭০ শতাংশ ঋণের মাধ্যমে জোগানের কথাও বলা হয়েছে।
PEZAB-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে অনুমোদিত বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের সংখ্যা ২৩টি। এর মধ্যে আটটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংগঠনটির বক্তব্য, অনেক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী এসব অঞ্চলে কারখানা স্থাপনে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে দেরি হওয়ায় বিনিয়োগ বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলের ক্ষেত্রে জমি বরাদ্দ করাই শেষ কথা নয়। শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সড়ক, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো আগে থেকেই নিশ্চিত করা না গেলে উদ্যোক্তার বড় অঙ্কের অর্থ দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। উৎপাদন শুরু না হওয়া পর্যন্ত সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত নগদ প্রবাহও আসে না। ফলে উচ্চসুদের স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভরশীল প্রকল্পে আর্থিক চাপ আরও বাড়ে।
এই বাস্তবতার একটি বড় উদাহরণ দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্য উৎপাদক ও সরবরাহকারী সিটি গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, ময়দা, লবণ, চাল ও ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, কৃষক, পরিবহনকর্মী, ডিলার ও ব্যবসায়ী যুক্ত রয়েছেন।
তবে হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরও গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির কিছু শিল্প ইউনিট প্রত্যাশিত মাত্রায় উৎপাদনে যেতে পারেনি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে নির্মিত এসব শিল্প ইউনিটের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো না গেলে বিনিয়োগের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত নগদ প্রবাহ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কারখানা উৎপাদনে না গেলেও ব্যাংকঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় চালিয়ে যেতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন ও নগদ প্রবাহের মধ্যে এমন ব্যবধান তৈরি হলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানও চলতি মূলধনের চাপে পড়তে পারে।
সিটি গ্রুপের ঋণ পরিস্থিতি নিয়েও ব্যাংকিং খাতে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের তথ্য এসেছে। জুনে ব্যাংকগুলো প্রতিষ্ঠানটির ঋণ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় একটি কমিটি গঠন এবং স্বাধীন নিরীক্ষকের মাধ্যমে আর্থিক অবস্থা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে সচল রেখে ঋণ পুনর্গঠনের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ঋণ পুনর্গঠনের প্রশ্নটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বড় উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যখন বিপুল কর্মসংস্থান, সরবরাহব্যবস্থা, ব্যাংকঋণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার যুক্ত থাকে, তখন প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রভাব বৃহত্তর অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
তবে উৎপাদনশীল শিল্পকে সহায়তার অর্থ অনিয়ম বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে ছাড় দেওয়া নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের পেছনে যদি দুর্নীতি, অনিয়ম বা অর্থের অপব্যবহার থাকে, তাহলে তার তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতা, বাজার ও কর্মসংস্থানের দিক থেকে কার্যকর থাকে এবং সংকটের মূল কারণ হয় অর্থায়ন, অবকাঠামো, জ্বালানি বা সাময়িক নগদ প্রবাহের সমস্যা, তাহলে স্বচ্ছ শর্তে পুনর্গঠন একটি বিবেচনাযোগ্য পথ হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও কৌশলগত শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংকটে পড়লে পুনর্গঠন, ঋণ পুনর্বিন্যাস ও উৎপাদন সচল রাখার নানা উদ্যোগ নেওয়ার নজির রয়েছে। এর উদ্দেশ্য সাধারণত একটি কোম্পানিকে নির্বিচারে রক্ষা করা নয়; বরং উৎপাদন, কর্মসংস্থান, সরবরাহব্যবস্থা ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ঠেকানো।
সিটি গ্রুপের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মাশিউল হক চৌধুরী বলেন, ‘সিটি গ্রুপ দীর্ঘ ৫৪ বছরের ইতিহাসে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করে আসছে; শুধুমাত্র খাদ্য নিরাপত্তাই নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সরকারের রাজস্ব সরবরাহ ঠিক রাখতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও আরও জোরালোভাবে যাতে তা করতে পারি সে জন্য বদ্ধপরিকর। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা আমাদের অংশীজনদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি এবং আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই পরিস্থিতি থেকে দ্রুতই আমরা ঘুরে দাঁড়াব।’
বর্তমান বৈশ্বিক খাদ্যবাজারের পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে শুধু আমদানি ব্যবস্থাপনা নয়, দেশের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখাও জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পে অর্থায়ন, জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো এবং ব্যাংকঋণের ব্যবস্থাপনাতেও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সমাধান প্রয়োজন।
কারণ একটি উৎপাদনশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল থাকার অর্থ শুধু একটি কোম্পানির ব্যবসা চালু থাকা নয়। এর সঙ্গে কৃষকের পণ্য বিক্রির সুযোগ, শ্রমিকের কর্মসংস্থান, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা, ব্যাংকের ঋণ ফেরতের সক্ষমতা এবং ভোক্তার কাছে পণ্যের ধারাবাহিক সরবরাহ—সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।
তাই সংকটের সময়ে নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একদিকে অনিয়ম ও জবাবদিহির বিষয়গুলো নিশ্চিত করা, অন্যদিকে বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ ও কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়ায় পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ দেওয়া। এতে শিল্প ও কর্মসংস্থান সচল রাখার পাশাপাশি ব্যাংক ও রাষ্ট্রের আর্থিক স্বার্থও সুরক্ষিত রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।


