অ্যালার্জি মানেই ছোটবেলা থেকে থাকা কোনো সমস্যা—এমন ধারণা ঠিক নয়। জীবনের যেকোনো পর্যায়ে নতুন করে অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। এমনকি দীর্ঘ সময় কোনো ধরনের অ্যালার্জি না থাকলেও প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে হঠাৎ কোনো খাবার, ধুলা, পরাগরেণু কিংবা অন্য কোনো উপাদানের প্রতি শরীর অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন করে অ্যালার্জি তৈরির পেছনে বংশগত কারণের পাশাপাশি পরিবেশ ও শরীরের বিভিন্ন পরিবর্তনও ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো অসুস্থতা, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, হরমোনের পরিবর্তন কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের টিকের কামড় থেকেও পরবর্তী সময়ে অ্যালার্জি তৈরি হওয়ার ঘটনা রয়েছে।
কেন হঠাৎ অ্যালার্জি দেখা দেয়?
ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ফুড অ্যালার্জি অ্যান্ড অ্যাজমা রিসার্চের পরিচালক রুচি গুপ্তার মতে, সব অ্যালার্জির পেছনে বংশগত কারণ কাজ করে না। অনেক সময় শরীরের বাইরে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এমনভাবে সক্রিয় করে, যার ফলে নিরীহ কোনো উপাদানকেও শরীর ক্ষতিকর হিসেবে শনাক্ত করতে শুরু করে।
সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট উপাদানকে শরীর বিপজ্জনক মনে করলে তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। পরে একই উপাদানের সংস্পর্শে এলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তখন হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ চুলকানো, ত্বকে ফুসকুড়ি বা শরীরের কোনো অংশ ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
কিছু ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া গুরুতর হতে পারে। শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ কমে যাওয়া কিংবা একাধিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে প্রাণঘাতী অ্যানাফাইল্যাক্সিসও হতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে সম্পর্ক কী?
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর কিছু মানুষের অ্যালার্জির প্রবণতা বাড়তে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর সম্ভাব্য একটি কারণ হলো অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমে পরিবর্তন।
মানুষের পরিপাকতন্ত্রে বিপুলসংখ্যক অণুজীব বাস করে। এসব অণুজীবের সমষ্টিকে মাইক্রোবায়োম বলা হয়। হজম প্রক্রিয়ার পাশাপাশি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমেও এর ভূমিকা রয়েছে।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে অন্ত্রের এসব অণুজীবের বৈচিত্র্য ও ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর প্রভাব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে। ফলে আগে যেসব উপাদানকে শরীর ক্ষতিকর মনে করত না, পরবর্তী সময়ে সেগুলোর প্রতিও অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।
তবে অ্যান্টিবায়োটিকের পর অ্যালার্জি হবে—এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গর্ভাবস্থায় বদলে যেতে পারে অ্যালার্জির ধরন
গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে ব্যাপক হরমোনগত পরিবর্তন ঘটে। এর প্রভাব পড়ে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাতেও। ফলে আগে থেকে থাকা অ্যালার্জির উপসর্গ কখনো বেড়ে যেতে পারে।
অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ কেলি কোলাসের মতে, পরিবেশগত অ্যালার্জিতে আক্রান্ত নারীদের একটি অংশের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় উপসর্গ আরও তীব্র হতে পারে। আবার আগে অ্যালার্জির ইতিহাস না থাকলেও গর্ভাবস্থায় হাঁচি, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ অবস্থাকে অনেক সময় ‘প্রেগন্যান্সি রাইনাইটিস’ বলা হয়। তবে এটি সব ক্ষেত্রে প্রকৃত অ্যালার্জি নয়। সন্তান জন্মের পর অনেকের এই সমস্যা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। এর সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি জানা না গেলেও হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
মেনোপজের পরও হতে পারে নতুন অ্যালার্জি
বয়স বাড়ার সঙ্গে অ্যালার্জির ঝুঁকি শেষ হয়ে যায়—এমনটিও নয়। মেনোপজের পর শরীরে হরমোনের মাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
ফলে যেসব নারীর আগে কোনো নির্দিষ্ট অ্যালার্জি ছিল না, তাদেরও মেনোপজের পর নতুন ধরনের অ্যালার্জির উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
টিকের কামড়ে লাল মাংসে অ্যালার্জি
নতুন অ্যালার্জির সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত কারণগুলোর একটি হলো নির্দিষ্ট প্রজাতির টিকের কামড়। উত্তর আমেরিকায় পাওয়া ‘লোন স্টার টিক’-এর কামড়ের পর কিছু মানুষের গরু, ভেড়া বা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাংসের প্রতি অ্যালার্জি তৈরি হতে পারে।
এই অবস্থাকে বলা হয় ‘আলফা-গ্যাল সিনড্রোম’। টিকের লালায় থাকা ‘আলফা-গ্যাল’ নামের একটি শর্করা অণুর সংস্পর্শে এসে শরীর সেটিকে ক্ষতিকর হিসেবে শনাক্ত করতে পারে। পরবর্তী সময়ে গরু, ভেড়া বা অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাংস খেলে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের প্রতিক্রিয়ায় ত্বকে চাকা বা ফুসকুড়ি, শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে যাওয়া এবং পেটের সমস্যা হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে আরও জটিল উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৯০ হাজারের বেশি মানুষের শরীরে এই সিনড্রোম শনাক্ত হওয়ার তথ্য সরকারি পর্যায়ে প্রকাশ করা হয়েছে।
এই অ্যালার্জি শনাক্ত করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস প্ল্যাটস-মিলসের। ২০০৭ সালে লন্ডনে ভেড়ার মাংস খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর তাঁর শরীরে আমবাতের মতো ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এর কয়েক মাস আগে হাইকিংয়ের সময় তাঁর শরীরে টিক লেগেছিল। পরবর্তী পরীক্ষায় তাঁর শরীরে অ্যালার্জিসংশ্লিষ্ট অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পাওয়া যায়। পরে এ ধরনের অ্যালার্জি নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়।
সব অ্যালার্জি কি স্থায়ী হয়?
নতুন করে অ্যালার্জি দেখা দিলেই সেটি সারাজীবন থাকবে—এমন নয়। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় হওয়া কিছু নাকের সমস্যা সন্তান জন্মের পর কমে যেতে পারে।
তবে কোনো অসুস্থতা, টিকের কামড় কিংবা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া অ্যালার্জি দীর্ঘ সময় থাকতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমে পরিবর্তন কিংবা কোনো অসুস্থতা-জনিত প্রদাহ অ্যালার্জির সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা নিয়েও গবেষণা চলছে।
অন্ত্রের অণুজীবের বৈচিত্র্য ধরে রাখতে দই, প্রিবায়োটিক, প্রোবায়োটিক ও ফারমেন্টেড খাবারের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তবে অ্যালার্জি প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় এগুলোকে নিশ্চিত সমাধান হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।
চিকিৎসায় এগোচ্ছে গবেষণা
অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে নতুন ধরনের চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা চলছে। ‘জোলএয়ার’ নামে পরিচিত ওমালিজুম্যাব ওষুধটি দীর্ঘদিন ধরে হাঁপানিসহ কিছু অ্যালার্জিজনিত সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। খাদ্য অ্যালার্জির ক্ষেত্রে গুরুতর প্রতিক্রিয়া কমাতে এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়েও গবেষণা হয়েছে।
এ ছাড়া অ্যালার্জেনের প্রতি শরীরের অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা কমানোর বিভিন্ন পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট অ্যালার্জেনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি ব্যবহারের চিকিৎসা নিয়েও গবেষণা চলছে।
তবে বর্তমানে নতুন করে তৈরি হওয়া সব ধরনের অ্যালার্জি পুরোপুরি নির্মূল করার নিশ্চিত কোনো পদ্ধতি নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানে গত দুই দশকে অ্যালার্জি সম্পর্কে বোঝাপড়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
উপসর্গ দেখা দিলে কী করবেন?
প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে হঠাৎ অ্যালার্জির মতো উপসর্গ দেখা দিলে নিজের মতো করে কারণ নির্ধারণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একই ধরনের সমস্যা বারবার হলে কোন খাবার, ওষুধ, পরিবেশ বা অন্য কোনো উপাদানের সংস্পর্শে এসে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তা শনাক্ত করা প্রয়োজন।
শ্বাসকষ্ট, গলা বা জিহ্বা ফুলে যাওয়া, মাথা ঘোরা কিংবা দ্রুত সারা শরীরে তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে বিষয়টি জরুরি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
অর্থাৎ, বয়স বেড়ে গেলেই অ্যালার্জির ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। শরীরের পরিবর্তন, হরমোন, ওষুধ, পরিবেশ কিংবা কিছু বিশেষ পরিস্থিতির কারণে জীবনের যেকোনো পর্যায়েই নতুন অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। সঠিক কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।


