ডিসেম্বরে অস্থিরতা প্রতিরোধে সতর্ক বিএনপি, তৃণমূলকে কঠোর বার্তা

আগামী ডিসেম্বরে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির যে কোনো অপতৎপরতা রুখে দিতে নেতাকর্মীদের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছে বিএনপি। দলীয়ভাবে মোকাবিলার পাশাপাশি সরকারও এ ব্যাপারে সজাগ রয়েছে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
দেশের রাজনীতিতে গত কয়েক মাস ধরেই আলোচনায় ‘ডিসেম্বর’। জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে আগামী ডিসেম্বরে ভারত থেকে ‘সম্মানজনকভাবে’ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। প্রচার চালানো হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, মূলত ডিসেম্বরকে ঘিরে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগের আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক।
সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টার অংশ হিসেবে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করছে আওয়ামী লীগ। তবে তাদের এমন পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিতে প্রস্তুত সরকার।
সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন; এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রোপাগান্ডার আবহ তৈরি করা হচ্ছে। এই আবহকে কাজে লাগিয়ে আগামী ডিসেম্বরে মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা।
শুধু ডিসেম্বর নয়; চলমান সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও কড়া নজর রাখছে বিএনপি। লক্ষ্য একটাই, যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যেন দেশের চলমান গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। এ জন্য দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতি বার্তা পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে কোনো ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত বা উসকানিতে পা না দেওয়ার পরার্শ দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র করছে পরাজিত শক্তি ও তাদের মদদদাতারা। তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে। তাই নাশকতা ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে সজাগ থাকবে। বিশেষ করে পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও দেশকে অস্থিতিশীল করার যে কোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বিএনপির অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলো রাজপথে সক্রিয় থাকবে। নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা হলে বিএনপি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। কারণ রাজপথ বা আন্দোলনের মাঠ কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি যে, পতিত সরকারের নেতাকর্মীরা ভিন্ন লেবাসে একের পর এক উসকানি দেবে আর আমরা চুপ করে বসে থাকব।’
আলোচনায় পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন
ঢাকা ও ঢাকার আশেপাশের কয়েকটি জেলায় সম্প্রতি রাজপথে নামেন পোশাকশ্রমিকরা। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে এই আন্দোলনে নামেন তারা। তবে গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এর পেছনে ইন্ধন জোগাচ্ছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবিকে হাতিয়ার করে শিল্পাঞ্চল অশান্ত করে তোলার চেষ্টা চলছে।
পোশাকশ্রমিক আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজপথ উত্তপ্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শ্রমিক সেজে বাসে ও পোশাক কারখানায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পতিত স্বৈরাচার পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে মদদ দিচ্ছে। তাদের বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছে। আমরা সেটি নজরে রাখছি। সারা দেশে দলের সব স্তরের নেতাকর্মীদের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সতর্ক থাকতে নির্দেশনা রয়েছে।’
তৎপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
ডিসেম্বরকেন্দ্রিক এই অস্থিতিশীলতার পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে বিএনপির পাশাপাশি সরকারও বহুমাত্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যৌথভাবে একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরি করছে। এতে এমন ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যারা ছদ্মনামে বা গোপনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। বিদেশে তহবিল পাঠাচ্ছেন কিংবা বিদেশ থেকে আসা অর্থ দেশের ভেতরে বিভিন্ন নাশকতামূলক গ্রুপের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন তালিকায়।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী কিছু আমলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রচ্ছন্ন সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিষয়ে খতিয়ে দেখছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

