সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্ধার হওয়া বেশ কয়েকটি চিরকুট নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশ চিরকুটগুলো উদ্ধারের কথা জানানোর পর সেগুলোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। লেখাগুলো মরিয়মের নিজের হাতে লেখা কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
এ অবস্থায় চিরকুটগুলোর হাতের লেখা নিয়ে প্রাথমিক বিশ্লেষণ করেছেন হস্তাক্ষর বিশ্লেষক ও ফরেনসিক সাইকোলজিস্ট মো. মিরাজ হোসেন। তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ফরেনসিক সাইকোলজি অ্যান্ড সাইন্সেসের পরিচালক।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) চিরকুটগুলো দেখে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ জানান মিরাজ হোসেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চিরকুটগুলোর মধ্যে একটি লেখায় চলতি বছরের ১২ জুলাইয়ের তারিখ পাওয়া গেছে। সেখানে ব্যবহৃত লেখার ধরন এবং পরবর্তী সময়ে লেখা কিছু চিরকুটের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
মিরাজ হোসেন বলেন, কালো ও লাল কালিতে লেখা চিরকুটগুলোর হাতের লেখার ধরনে কিছুটা অমিল দেখা যায়। তবে একই ব্যক্তির হাতের লেখা সময়, মানসিক অবস্থা কিংবা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে পরিবর্তিত হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

‘লেখায় মানসিক চাপের কিছু ইঙ্গিত রয়েছে’
ফরেনসিক বিশ্লেষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জুলাই মাসে লাল কালিতে লেখা অংশগুলো তুলনামূলকভাবে সোজা ছিল। কোথাও কোথাও কাটাকাটি ও একই জায়গায় পুনরায় লেখার প্রবণতাও দেখা গেছে। তাঁর মতে, এসব বৈশিষ্ট্য লেখার সময় বিরক্তি বা মানসিক অস্বস্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
অন্যদিকে কালো কালিতে লেখা একটি চিরকুটে দীর্ঘ দাগ টানার বিষয়টি উল্লেখ করে মিরাজ হোসেন বলেন, এমন লেখার ধরন লেখকের আবেগপ্রবণ অবস্থার ইঙ্গিত দিতে পারে।
চিরকুটের কিছু শব্দ ও অক্ষরের আকার বিশ্লেষণ করে তিনি মনে করেন, লেখকের মধ্যে সম্পর্ক ও সঙ্গীর কাছ থেকে প্রত্যাশার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। বিশেষ করে কিছু শব্দের শেষে অতিরিক্ত চাপ বা মাত্রা দেওয়ার বিষয়টিও তাঁর পর্যবেক্ষণে এসেছে।
তবে এসব বৈশিষ্ট্যকে একা কোনো ব্যক্তির আত্মহত্যার সিদ্ধান্তের নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম।

হাতের লেখায় অমিল কেন?
লাল ও কালো কালিতে লেখা অংশের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে মিরাজ হোসেন বলেন, লেখাগুলো একই ব্যক্তির কি না, তা শতভাগ নিশ্চিত করতে হলে মরিয়ম খাতুনের আগের সময়ের স্বীকৃত হাতের লেখার নমুনা প্রয়োজন।
তাঁর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে অন্য কারও লেখা হওয়ার সম্ভাবনা কম মনে হলেও, এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও নমুনা পরীক্ষা করা দরকার বলে তিনি জানান।
কালো কালির লেখায় অক্ষর ও শব্দের সংযোগ এবং লেখার বিন্যাসের বিষয়টিও তিনি বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে লেখকের মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।

আত্মহত্যার আগের মানসিক অবস্থা বোঝা সম্ভব?
মিরাজ হোসেনের মতে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় একজন মানুষের হাতের লেখায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কালো কালিতে লেখা অংশে লাইন শুরুর স্থান ও লেখার বিন্যাসে কিছুটা অগোছালো প্রবণতা দেখা গেছে বলেও তিনি জানান। তাঁর ব্যাখ্যায়, এটি লেখকের সে সময়কার অস্থিরতা বা অনিয়মিত মানসিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, মরিয়মের আগের সময়ের নির্ভরযোগ্য হাতের লেখার সঙ্গে এসব চিরকুটের লেখা তুলনা না করা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে সবগুলোই তাঁর লেখা।
মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্ধার হওয়া এসব চিরকুট এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা, হাতের লেখার তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং ময়নাতদন্তসহ অন্যান্য তদন্তের ফলাফল সামনে এলে চিরকুটগুলোর লেখক এবং মৃত্যুর আগে তাঁর মানসিক অবস্থার বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে।


